ময়মনসিংহের নান্দাইলে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ আসে। ১০-১৫ মিনিট থেকে আবার চলে যায়। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় দেড় ঘণ্টাও বিদ্যুৎ মেলে না। বগুড়ার সেউজগাড়ী এলাকার বাসিন্দা শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ২৪ ঘণ্টায় প্রতিদিন ৭-৮ বার বিদ্যুৎ যায়। একবার গেলে দুই ঘণ্টায় আর আসে না। সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণবাজারের মোবাইল ব্যবসায়ী সাকিব আল মামুন বলেন, দিন-রাতে ১০-১২ বার লোডিশেডিং হচ্ছে। ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
পাবনায় ২৪ ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে ৭ বার। চট্টগ্রামের চন্দনাইশে দৈনিক ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। দেড় মাস ধরে বিদ্যুতের ভোগান্তি চলছে। এক সপ্তাহ ধরে সারাদেশের লোডশেডিং চরম আকার ধারণ করেছে। খোদ রাজধানীতেই দিনে তিন-চারবার লোডশেডিং হচ্ছে। এলাকাভেদে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। মফস্বলের অবস্থা ভয়াবহ। সেখানে বিদ্যুৎ থাকে না, মাঝেমধ্যে আসে।

বান্দরবান জেলা শহরে গত ২৪ ঘণ্টায় লোডশেডিং হয়েছে ৮-১০ বার। দিনে টানা ২-৩ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না।

গ্যাস সংকটের কারণে জুলাই মাসের শুরুতেই বিদ্যুতের উৎপাদন কমে যায়। অর্থ সাশ্রয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কম চালানো হচ্ছে। বিপরীতে গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেছে। সরকার লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে।

দেশজুড়ে তীব্র গরম পড়ছে। এর মধ্যে লোডশেডিং ভোগান্তির মাত্রাকে চরমে নিয়ে গেছে। ঘরে-বাইরে, কলকারখানা, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সব স্থানেই লোডশেডিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিল্পের উৎপাদন।

জনগণ বিদ্যুৎ নিয়ে চরম বিপাকে থাকলেও সরকারি তথ্যে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক বলে তুলে ধরা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) গতকাল বুধবার সারাদেশে মাত্র ৪৪০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের প্রাক্কলন করেছিল; যেখানে শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ঘাটতি ছিলা দেড় হাজার মেগাওয়াট। পিডিবির দাবি, বুধবার সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ধরা হয়েছিল ১২ হাজার ৮৩০ মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৩৯৭ মেগাওয়াট। এ হিসাবে, সারাদেশে নামমাত্র লোডশেডিং থাকার কথা। তবে পাঁচটি বিতরণ কোম্পানির সূত্রমতে, গতকাল লোডশেডিং ছিল প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট।

রাজধানীর চিত্র :ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা আকরামুল হক জানান, মঙ্গলবার তাঁর এলাকায় তিনবারে প্রায় চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। বুধবারও সন্ধ্যা পর্যন্ত দুইবার লোডশেডিং হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল রাজধানীতে এলাকা ভেদে দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।

ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ডিপিডিসি এলাকায় গতকাল বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৩০০ মেগাওয়াট। কোনো কোনো এলাকায় তিন-চারবারও লোডশেডিং হয়েছে। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, গত কয়েক দিন থেকে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ কম পাচ্ছেন। ফলে বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে। অপর বিতরণ কোম্পানি ডেসকোর ঘাটতি ছিল ৮২ মেগাওয়াট।

বাণিজ্যিক রাজধানীতে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং : চট্টগ্রাম মহানগরে এখন প্রতিদিনই ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। বিভাগের প্রতিটি জেলা ও গ্রামেও প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টার মতো লোডশেডিং হচ্ছে। সীতাকুণ্ডে মঙ্গলবার বিকেল থেকে বুধবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত ১২টি ফিডারে দুই ঘণ্টা করে লোডশেডিং করা হয়েছে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ (পটিয়া) ব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাত ১১টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে সাড়ে তিন ঘণ্টা থেকে চার ঘণ্টা। সকাল ৮ থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। দোহাজারী বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের আবাসিক প্রকৌশলী মো. আরাফাত হোসেন জানান, ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ চন্দনাইশের ডিজিএম আবু সুফিয়ান জানান, বর্তমানে দৈনিক সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টার মতো লোডশেডিং হচ্ছে।
কর্ণফুলী এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার মতো লোডশেডিং হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। বোয়ালখালীতে ২৪ ঘণ্টায় ৬ বার লোডশেডিং হয়েছে। ফটিকছড়ি উপজেলায় দৈনিক ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন। চকরিয়ায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চকরিয়া আবাসিক প্রকৌশলী গীতিবসু চাকমা বলেন, ৮-৯ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।

কুমিল্লা নগরীতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত ৩ দফায় আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। বুধবার ভোর থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ৩ দফায় বিদ্যুৎ ছিল না আড়াই ঘণ্টা। লক্ষ্মীপুরে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৮ দফায় আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। তবে লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার জাকির হোসেন বলেন, রাত-দিন মিলে ৪-৫ বার লোডশেডিং হচ্ছে। ফেনীতে তিনবার করে ৫-৬ ঘণ্টা করে লোডশেডিং করা হচ্ছে। কক্সবাজারের গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা এবং শহর এলাকায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।

রংপুরে ভোগান্তি চরমে : দিন-রাতে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় রোদ ও ভ্যাপসা গরমে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে শিশু-বৃদ্ধসহ সবাই। রংপুর নগরীরসহ জেলার ৮ উপজেলায় দিন-রাতে এলাকা ভেদে ৭ থেকে ৮ বার বিদ্যুৎ যাচ্ছে। একবার গেলে অন্তত এক ঘণ্টার আগে আসে না বিদ্যুৎ। রংপুর নগরীর জগদীশপুর মণ্ডলপাড়ার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, ২৪ ঘণ্টায় ৬ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করেছে। একই অবস্থা নগরীর নিউ ইঞ্জিনিয়ারপাড়া, সেন্ট্রাল রোড, বাহার কাছনা, কামাল কাছনা, সাতমাথাসহ নগরী ও উপজেলাগুলোতে।

লালমনিরহাট সদর, কালীগঞ্জ, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধাসহ ৪ উপজেলায় প্রতিদিন এক থেকে দেড় ঘণ্টা করে একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। পঞ্চগড়ে দিনে কয়েক দফায় ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা আর সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে কয়েক দফায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।

কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার মোস্তফা কামাল জানান, হাসপাতাল এবং কোল্ডস্টোরেজ আছে- এমন ১৭টি ফিডারে প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে এবং বাকি ফিডারে প্রতিদিন অন্তত ৪ ঘণ্টা করে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। ঠাকুরগাঁওয়ে বুধবার ২৪ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ ছিল প্রায় ১৫ ঘণ্টা।

সিলেটে গ্রামাঞ্চলের মানুষ অতিষ্ঠ :সিলেটে গ্রামাঞ্চলে ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। ৩-৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের বড় হাট জামালগঞ্জের সাচনা বাজারের ব্যবসায়ী আকবর হোসেন বলেন, মঙ্গলবার বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না সাচনা বাজারে। ৭টায় বিদ্যুতের দেখা মিললেও ৯টায় আবার আধাঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ ছিল না। এরপর এলেও ১১টা থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত অন্ধকারে ছিল বাজার। বুধবার সকাল ১০টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ের নতুন বাজারের ব্যবসায়ী সোহেল আহমেদ জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। গতকাল বিকেল পর্যন্ত একাধিকবার লোডশেডিং হয়েছে।

রাজশাহীতে গ্রামাঞ্চলে ভয়াবহ লোডশেডিং : নগরীতে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে। প্রায় প্রতিদিনই একাধিকার লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। কোথাও কোথাও দিনের অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না। বাঘায় দিনে অন্তত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। চারঘাটে মঙ্গলবার বিকেল ৪টা থেকে বুধবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত (২৪ ঘণ্টার মধ্যে) ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।

ঈশ্বরগঞ্জে বিদ্যুৎ থাকছে না ১০ ঘণ্টা :ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে মঙ্গলবার বিকেল ৪টা থেকে বুধবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৮ দফায় ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়।

খুলনায়ও ভোগান্তি :প্রায় এক মাস ধরে চলছে ব্যাপক লোডশেডিং। এর ফলে গরমে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎনির্ভর সব কাজকর্ম বিঘ্নিত হচ্ছে। নগরীর শেখপাড়া প্রধান সড়কের বিদ্যুৎ গ্রাহক ইয়াসির আরাফাত বলেন, গত ৮-১০ দিন ধরে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার কম লোডশেডিং কখনও হয়নি। কয়রা উপজেলার মদিনাবাদ গ্রামের মো. মনিরুজ্জামান ও কয়রা সদরের রবিউল ইসলাম বলেন, দিন-রাত মিলে প্রায় ৭-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। রাতে টানা ৩-৪ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে ঠিকমতো ঘুমানো যাচ্ছে না। দাকোপ উপজেলার চালনা বাজারের লন্ড্রির দোকানি রসময় বৈরাগী বলেন, প্রতিদিন ৮-৯ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

পাবনায় বিদ্যুৎ যায় না আসে :পাবনায় এখন আর বিদ্যুৎ যাওয়ার অপেক্ষায় কেউ থাকে না, কখন আসে সেই প্রতিক্ষায় সবাই প্রহর গোনে। গত ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার বিকেল ৪টা থেকে বুধবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত) ৭ বার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয় এখানে।
জয়পুরহাট :জেলার কালাই উপজেলার বানিহারা গ্রামের বাসিন্দা আজমল হোসেন বলেন, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত সময়ে চরম দুর্ভোগের মধ্যে কেটেছে। রাতে দুই ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ এসে ১৫ মিনিট থেকেই আবার চলে গেছে। আবার দুই ঘণ্টা পরে এসে একটু থেকেছে।

১২ ঘণ্টা লোডশেডি :যশোর শহর এলাকার চেয়ে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। কোথাও কোথাও দিন-রাত মিলিয়ে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বগুড়ায় ঘণ্টায় ৭-৮ বার লোডশেডিং হচ্ছে। এতে গড়ে ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ মিলছে না
সাতক্ষীরা :শহরের পলাশপোল গ্রামের জামাল উদ্দিন (৪৫) জানান, এক সপ্তাহ ধরে রাতে ৭ থেকে ৮ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। দিনে একই অবস্থা। তাঁর বাড়িতে ৪ জন বয়স্ক ও রোগী রয়েছেন। প্রচণ্ড গরমে পুরো পরিবার কষ্ট পাচ্ছে।
(প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন সমকাল ব্যুরো, অফিস ও প্রতিনিধিরা)