হাতি চলাচলের স্থান ও বাসস্থান সবকিছুই দখল করে নিচ্ছে মানুষ। উন্নয়নের জাঁতাকলে পড়ে অসহায় মৃত্যু হচ্ছে শক্তিধর ঐরাবতের। বনাঞ্চল ধ্বংস করে উন্নয়ন প্রকল্প, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের কারণে অন্যতম আবাসস্থল কক্সবাজারের বিশাল বনভূমি উজাড়, বনের জমিতে কৃষিকাজ ও বাসস্থান নির্মাণের কারণে বিলুপ্তির পথে বৃহৎ প্রাণীটি। বন দখলকারী একটি চক্র ভাড়াটে খুনিদের নিয়ে হাতি হত্যা করাচ্ছে। আবার নিজেদের আস্তানা হারিয়ে লোকালয়ে গেলে মেরে ফেলা হচ্ছে তাদের।

এ অবস্থায় হাতি রক্ষায় বিশ্বজুড়ে আন্দোলনের অংশ হিসেবে আজ শুক্রবার বিশ্ব হাতি দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও বেশ কিছু সংগঠন দিবসটি পালন করবে। এ রকম সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন সত্ত্বেও কয়েক বছর ধরে দেশে মানুষের হাতে হাতির মৃত্যু বাড়ছেই। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের ২০১৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট হাতির সংখ্যা ২১০ থেকে ৩৩০। বন বিভাগের হিসাবে, ১৯৯২ থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৪৫টি বন্যহাতির মৃত্যু হয়। এর মধ্যে সর্বশেষ ছয় বছরেই মারা গেছে অর্ধেকের বেশি।

২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ৭৭টি বন্যহাতি। ২০২০ সালে হত্যা করা হয়েছে ১২টি। ২০০৩ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বছরে তিন থেকে চারটি হাতি হত্যা করা হয়। আর ২০২১ সালে মারা যায় ৩৪টি। তবে চলতি বছর হত্যা কমে এসেছে। এ বছরের জুলাই পর্যন্ত দুটি হত্যার খবর পাওয়া গেছে।

ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চলাচল করা মহাবিপন্ন এশীয় হাতি মূলত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বনভূমি দিয়ে চলাচল করে। এখানে নির্মাণাধীন একটি রেলপথজুড়ে ২১টি স্থানে রয়েছে হাতির চলাচল ও বসবাসের এলাকা। ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের ওই পথে ইসলামাবাদ, ডুলাহাজারা, চকরিয়া, হারবাং, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও দোহাজারীতে রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ এলাকাগুলোয় রয়েছে শতাধিক হাতির বিচরণ। এ রেললাইন নির্মাণকাজ শেষ হবে ২০২৩ সালে। ২০১৮ সালে ওই রেলপথের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকে ৫৫টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।

৩৩টি পরিবেশবাদী সংগঠনের সমন্বিত ফোরাম বাংলাদেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ জোট (বিএনসিএ) চলতি বছর এক প্রতিবেদনে জানায়, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের পানেরছড়া ও ধোয়াপালং রেঞ্জের ১৩ হাজার ৬৫ একর বনভূমির মধ্যে অর্ধেকের বেশি অবৈধ দখলে চলে গেছে। এ ছাড়া চারপাশে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা বনভূমির ওপর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাে হাতি চলাচলের পথ (করিডোর) ও আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে। ফলে আনুমানিক ১০০ একর জায়গায় প্রায় ৪০টি মতো হাতি আটকা পড়েছে। বনভূমিতে অবৈধ বসতবাড়ি, পানের বরজ, বিভিন্ন ক্ষেত-খামার, ঘের, বিদ্যুৎ সংযোগসহ বিভিন্ন কর্মকাে হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য চরম হুমকি তৈরি করেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান বলেন, হাতির আবাসস্থলগুলোকে আবারও গড়ে তুলতে হবে। তাদের ঝুঁকিমুক্ত চলাচল নিশ্চিত করার জন্য করিডোরগুলোকে সুরক্ষিত করতে হবে।