বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের দাম এখন আকাশচুম্বী। রেশনিং-লোডশেডিং করেও দেশে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ঘাটতি মেটাতে অনেক বেশি দামে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। কারণ, গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে; কিন্তু দেশে উৎপাদন কমছে।

তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রাথমিক কাজই হলো জিওলজিক্যাল সার্ভে বা ভূতাত্ত্বিক জরিপ। এর মাধ্যমে মাটির নিচে কোথায়, কী সম্পদ আছে- তার একটি ধারণা পাওয়া যায়। বর্তমান সরকার আট বছর আগে সাগরে একটি জরিপকাজ হাতে নেয়। কিন্তু এখনও শুরুই করতে পারেনি। পাঁচ বছর ঝুলিয়ে রেখে একটি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয় ২০২০ সালে। এরপরও দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সাগরে উল্লেখযোগ্য কোনো জরিপকাজই হয়নি।

পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে গ্যাস আবিস্কার করলেও বাংলাদেশ একমাত্র সাঙ্গু ছাড়া কোনো সফলতা পায়নি। মেলেনি সমুদ্র জয়ের কাঙ্ক্ষিত সুফল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভূতত্ত্ববিদ বদরূল ইমাম বলেন, ভারত ও মিয়ানমার তাদের সমুদ্রসীমায় বিপুল গ্যাসসম্পদের খোঁজ পেয়েছে। মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে গ্যাস তুলছে এবং তা রপ্তানি করছে চীনে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও জরিপই শুরু করতে পারেনি।

বঙ্গোপসাগরের অগভীর ও গভীর অংশকে মোট ২৬টি ব্লকে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে অগভীর অংশে ব্লক ১১টি। আর গভীর সমুদ্রে ব্লক ১৫টি। অগভীর সমুদ্রের ৯ নম্বর ব্লকে ১৯৯৬ সালে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কার করে কেয়ার্ন এনার্জি। এখানকার গ্যাস তোলা শেষে ২০১৩ সালে ক্ষেত্রটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

বহুমাত্রিক জরিপ: আন্তর্জাতিক আদালতে ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সাগর সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির পর সর্বমোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র অঞ্চলের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের। এরপর বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্রে ভালো সাড়া না মেলায় সরকার পুরো সমুদ্রসীমায় একটি পূর্ণাঙ্গ বহুমাত্রিক জরিপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভে নাম দিয়ে ২০১৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। দরপত্র মূল্যায়নে নরওয়ের কোম্পানি টিজিএস এবং ফ্রান্সের স্কামবার্জার কনসোর্টিয়াম যোগ্য বলে নির্বাচিত হয়। এরপর পেট্রোবাংলা প্রস্তাব চূড়ান্ত করে চুক্তিপত্র অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটির সায় নিতে জ্বালানি বিভাগে ফাইল পাঠায়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অজ্ঞাত কারণে বাতিল করে আবার দরপত্র আহ্বানের জন্য পেট্রোবাংলাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

অভিযোগ আছে, একটি স্বার্থান্বেষী মহলের পছন্দের কোম্পানি কাজ না পাওয়ায় দর প্রক্রিয়া ঝুলে যায়। পরে ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পুনঃদরপত্র আহ্বান ও ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি দরপত্র খোলা হয়। এবারও পাঁচটি প্রস্তাব জমা পড়ে। এগুলো হলো- টিজিএস-স্কামবার্জার কনসোর্টিয়াম, ডিএমএন জেএসসি, এসপিইসি পার্টনার্স-সিনোপ্যাক-জিয়োট্রেস জয়েন্টভেঞ্চার, বিজিপি ইনঙ্ক, চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-আইওএস জিওফিজিক্যাল করপোরেশন-স্পেকট্রাম্প জেভি এবং মেরিন আর্কটিক জিওলজিক্যাল এক্সপেন্ডেশন জেএসসি। এবারও দরপত্র প্রক্রিয়ায় টিজিএস-স্কামবার্জার কনসোর্টিয়াম প্রথম হয়। এরপর চুক্তির প্রস্তাবনা জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উত্থাপন করা হয়। সেখানে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী দর প্রক্রিয়া সঠিক হয়নি বলে আপত্তি জানান। পরে দরপত্র মূল্যায়নের যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ২০১৭ সালে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে পাঠায়। প্রভাবশালী মহলের পছন্দের কোম্পানি ছিল এসপিইসি পার্টনার্স, যাদের মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভে-সংক্রান্ত যোগ্যতা এবং সক্ষমতা খুবই কম। কোম্পানিটি দর প্রক্রিয়াতেই বাতিল হয়েছিল। এরপরও দীর্ঘদিন এই প্রস্তাব আটকে রাখা হয়। পরে সরকারের ওপর মহলের হস্তক্ষেপে ২০২০ সালের মার্চে টিজিএস-স্কামবার্জার কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। এরপর দুই বছর পার হয়েছে। এখনও সাগরে জরিপকাজ শুরু হয়নি।

পেট্রোবাংলার সূত্রমতে, মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভে হলো আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো (আইওসি) ঠিকাদার কোম্পানির মাধ্যমে নির্ধারিত এলাকায় জরিপকাজের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ করে। ঠিকাদার কোম্পানি জরিপের প্রাপ্ত ফল, অর্থাৎ জরিপের তথ্য এসব কোম্পানির কাছে বিক্রি করে। আইওসিগুলো এসব তথ্য বিশ্নেষণ করে অনুসন্ধান করা কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশের সর্বশেষ উত্তোলন-অংশীদারিত্ব চুক্তি, অর্থাৎ মডেল পিএসসি ২০১৯ আইওসির কাছে আকর্ষণীয় নয়। তাই ঠিকাদার টিজিএস-স্কামবার্জার কোনো বিনিয়োগকারী পাচ্ছে না। এ জন্য মডেল পিএসসি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০২০ সালে। কিন্তু পেট্রোবাংলার এক পরিচালকের গাফিলতিতে এই কার্যক্রম প্রায় দেড় বছর ফাইলবন্দি থাকে। পরে ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপে গত বছরের শেষ দিকে টেন্ডারের মাধ্যমে এই কাজে আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থা নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সংস্থা এখনও তার প্রতিবেদন জমা দেয়নি। তারা প্রতিবেদন দিলে পিএসসিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। এরপর আইওসিরা আগ্রহী হলে মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভেতে বিনিয়োগ করবে। তারপর জরিপকাজ শুরু হতে পারে বলে সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

কনোকোফিলিপস: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তেল-গ্যাস কোম্পানি কনোকোফিলিপস ২০০৮ সালের দরপত্র প্রক্রিয়ায় গভীর সমুদ্রের ডিএস-১০ ও ডিএস-১১ নম্বর ব্লক ইজারা পেয়েছিল। দুই বছর অনুসন্ধান কাজ করার পর গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল কোম্পানিটি। তারা চুক্তি সংশোধন করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির দাবি জানায়। এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় ২০১৪ সালে ব্লক দুটি ছেড়ে দেয় কনোকো। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ডাকা অন্য আরেক আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রের ডিএস-১২, ডিএস-১৬ ও ডিএস-২১ এই তিন ব্লকের জন্য যৌথভাবে দরপ্রস্তাব জমা দিয়েছিল কনোকো ও স্টেট অয়েল। পরবর্তী সময়ে কনোকো নিজেকে সরিয়ে নেওয়ায় ব্লকগুলো ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি। একই সময়ে অগভীর সমুদ্র্রের ব্লকগুলোর জন্য ভিন্ন একটি দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। এই দর প্রক্রিয়া এসএস ১১ নম্বর ব্লক সান্তোস ও ক্রিস এনার্জি এবং এসএস ৪ ও এসএস ৯ নম্বর ব্লক ভারতীয় দুটি কোম্পানি ওএনজিসি ভিদেশ (ওভিএল) ও অয়েল ইন্ডিয়া (ওআইএল) ইজারা নিয়েছিল। সান্তোস এসএস-১১ ব্লকে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক জরিপ করার পর কূপ খনন না করেই বাংলাদেশ থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। ওএনজিসি দুই ব্লকে থ্রি-ডি ও টু-ডি সাইসমিক জরিপ চালানোর পর ৪ নম্বর ব্লকে একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করেছিল; কিন্তু গ্যাস মেলেনি। তারা আরও দুটি কূপ খনন করবে বলে জানা গেছে।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর (আইওসি) কাছ থেকে আগ্রহপত্র চায় পেট্রোবাংলা। সিঙ্গাপুরের ক্রিস এনার্জি, দক্ষিণ কোরিয়ার পোসকো দাইয়ু ও নরওয়ের স্টেট অয়েল আগ্রহ প্রকাশ করে। পরে প্রস্তাব চাওয়া হলে শুধু গভীর সমুদ্রের ১২ নম্বর ব্লকের জন্য দাইয়ু প্রস্তাব দাখিল করে। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে দাইয়ু করপোরেশনের সঙ্গে উৎপাদন-অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) সই করে পেট্রোবাংলা। দাইয়ুর দ্বিমাত্রিক জরিপে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল। তারাও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির দাবি জানায়। কিন্তু সমঝোতা হয়নি। পরে দাইয়ুও চলে গেছে।

বিষয় : সমুদ্র জয় তেল-গ্যাসের দাম জালনি সংকট

মন্তব্য করুন