সারাজীবন ওরা জেলে পইচ্যা মরুক। ওদের মুখ আমি দেখতে চাই না- তিন ছেলে সম্পর্কে সত্তরোর্ধ্ব জয়নাল আবেদিনের খেদোক্তি। গতকাল শনিবার সমকালকে কথাগুলো বলার সময়ও বাবার বুকে রক্তক্ষরণ ছিল স্পষ্ট। যে সন্তানদের জন্য নিজের আরাম-আয়েশ, শখ-আহদ্মাদ বিসর্জন দিয়েছেন জয়নাল আবেদিন ও হনুফা বেগম দম্পতি, তারাই জমি বিক্রির টাকা আত্মসাতে ছিনতাইকারী সেজে মারধর করে জন্মদাতা বাবার হাত-পা ভেঙে দিয়েছে।

রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার মানিকদী এলাকায় গত ২৮ জুন হৃদয়বিদারক এ ঘটনা ঘটে। দীর্ঘদিন ছায়াতদন্তের পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগের একটি টিম শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও ঢাকায় অভিযান চালিয়ে জয়নাল আবেদিনের দুই ছেলে মো. হান্নান ও মো. মান্নান এবং তাদের সহযোগী মো. সোহেলকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে বৃদ্ধের ছিনতাই হওয়া ৩৩ লাখের মধ্যে ২৯ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। গতকাল দুই ছেলেকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ খবর দিলেও জয়নাল ও তাঁর স্ত্রী সন্তানদের মুখ দর্শনে রাজি হননি। পুলিশ বলছে, আদালতের মাধ্যমে জব্দ অর্থ জয়নালের হাতে শিগগির তুলে দেওয়া হবে।

জয়নালের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁর তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। বিয়েশাদির পর যে যার মতো বসবাস করছে। মেজো ছেলে হান্নান ও ছোট ছেলে মান্নানের যৌথ রেস্টুরেন্ট ব্যবসা আছে। বড় ছেলে হানিফের হার্ডওয়্যারের দোকান। জয়নালের আদি বসত মানিকদী। পৈতৃকভাবে সেখানেই তাঁর আড়াই কাটা জমি রয়েছে। এক সময়ের মুদি দোকানি জয়নাল সুখের আশায় সন্তানদের বড় করেন। কিন্তু সন্তানরা বিয়ে করার পর এই বৃদ্ধ দম্পতির আরেক জীবনযুদ্ধ শুরু হয়। তিন ছেলের কেউই বাবা-মায়ের দেখভাল করেনি।

জয়নাল জানান, এ বছরের শুরুতে পৈতৃক জমি একটি ডেভেলপার কোম্পানির কাছে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জুনে বনানীতে আল-মামুন নামে এক ডেভেলপার মালিকের সঙ্গে পাকা কথা হয়। জমিতে ভবন হবে, ফ্ল্যাটের অর্ধেক পাবেন জয়নাল। এতে তাঁর ভাগে ৯টি ফ্ল্যাট থাকার কথা। আর নগদ ৩৩ লাখ টাকা দেওয়া হবে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় বনানীতে ডেভেলপারের অফিস থেকে জমি বিক্রির টাকা ব্যাগে নিয়ে বাসার দিকে রওনা হন জয়নাল। সঙ্গে ছিলেন শারীরিক প্রতিবন্ধী ছোট মেয়ের জামাই মাহফুজুর রহমান। মোটরসাইকেলে শ্বশুর-জামাই মানিকদীর বাসার কাছে সরু গলিতে পৌঁছামাত্র আলো-আঁধারিতে দু'জন অতর্কিত হামলা করে। প্রথমে তাঁরা জয়নালকে রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। এক পর্যায়ে জয়নাল খেয়াল করেন, হামলাকারী তার বড় ছেলে হানিফ। শ্বশুরকে রক্ষায় এগিয়ে গেলে মাহফুজুরকেও বেধড়ক পেটানো হয়। এতে তাঁদের হাত-পা ভেঙে যায়। মিনিট পাঁচেক পর আরও দু'জন যুক্ত হয়। তারা জয়নালের মেজো ও ছোট ছেলে। মারধরে জয়নাল অচেতন হয়ে পড়লে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।

সুস্থ হওয়ার পর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে এই ঘটনা ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশকে জানান জয়নাল। তবে টাকাসহ গা-ঢাকা দেওয়ায় থানা-পুলিশ হামলাকারীদের টিকিটি স্পর্শ করতে পারেনি। উল্টো মাঝে মাঝে স্থানীয় মাস্তান ও সরকারদলীয় নেতাদের ব্যবহার করে থানা থেকে অভিযোগ তুলে নিতে জয়নালকে চাপ দিতে থাকে ছেলেরা।

চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন জয়নাল আবেদিন-সমকাল


কথা বলার ফাঁকেই জয়নালের চোখ গড়িয়ে পানি পড়তে থাকে। মুছতে মুছতেই তিনি বলে চলেন- বাবারে, এমন সন্তান যেন কারও না হয়। এমন সন্তান জন্ম দেওয়ার চেয়ে নিঃসন্তান থাকা ভালো। আমারে গরুর মতো পিটিয়েছে, কেমনে পারল ওরা। যাদের সামান্য জ্বর-সর্দি হলেও আমরা সারারাত ঘুমাতে পারতাম না। তারা এমন নিষ্ঠুর কীভাবে হলো! হাত-পায়ে ১০টির বেশি সেলাই লেগেছে। ছিনতাইকারী সেজে ওরা ওঁৎ পেতে ছিল। মারধরে আধমরা হয়ে পড়লে টাকার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে গেছে। ৩৩ লাখ টাকার মধ্যে ১ হাজার টাকার নোটের বান্ডিল ২৬টি, বাকিগুলো ৫০০ টাকার। আমার এ কুলাঙ্গার তিন ছেলে যেন সারাজীবন জেলে পইচ্যা মরে।

জয়নালের স্ত্রী বলেন, 'ছেলেদের কিসের কষ্ট? প্রত্যেককে ৫ লাখ টাকা করে দিয়েছি। দোকানপাট দিয়ে যে যার মতো করে খাচ্ছে। ঘরে কারও অভাব নেই। কেন বাপরে মাইর‌্যা টাকা নিতে অইব? এমন সন্তান থাকলে সমাজে বাপ-মা কীভাবে মুখ দেখাবে? সন্তানদের কত কষ্ট করে বড় করলাম, এখন এমন দিন দেখতে অইলো? কপালে এইড্যা লেখা ছিল? ওদের তো ভাগ ভাগ করে ফ্ল্যাট দিতাম। এমনকি জমির বিক্রির নগদ টাকাও সমানভাবে দেওয়ার কথা ছিল। পুরো টাকা তিন ভাই মিলে নেওয়ার জন্য কী লজ্জাজনক ঘটনা ঘটাল! তিনি আরও বলেন, আমাদের ছোট মেয়েটা শারীরিক প্রতিবন্ধী। ওর জামাইয়েরও দুই পা ভেঙে দিয়েছে আমার ছেলেরা। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে মা-বাবার জীবনে।'

বাবার টাকা আত্মসাতে সন্তানদের এমন বর্বর কাণ্ডে স্থানীয়রাও হতবাক। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগেও নানা অজুহাতে জয়নালকে একাধিকবার মারধর করেছে ছেলেরা। সন্তানদের মারধরে মারা যেতে পারেন- এমন আশঙ্কা থেকে মানিকদীর বাসা ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে তুরাগে বসবাস শুরু করেন জয়নাল। সেখানে ছোট মেয়ে তাঁদের দেখভাল করতেন।

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩-তে বলা আছে, প্রত্যেক সন্তান তাঁদের পিতা-মাতাকে ভরণপোষণ করবেন। কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন। কোনো সন্তান পিতা-মাতার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বৃদ্ধ নিবাস বা অন্য কোথাও আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। এই আইনে এও বলা আছে, সন্তান তাঁর পিতা-মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ নেবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যা করবে।

ডিবির গুলশান বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, জয়নাল আবেদিনের তিন সন্তানই সচ্ছল। মা-বাবাকে দেখভাল না করে অত্যাচার করত। এ জন্য বৃদ্ধ বয়সে তাঁরা বাড়িছাড়া হয়েছিলেন। আবার ছিনতাইকারী সেজে বাবার জমি বিক্রির টাকা তিন ভাই মিলে হাতিয়ে নিয়েছে। সন্তানের হাতে রক্তাক্ত হওয়া কোনো মা-বাবার বুকের রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে অর্থ হারানোর যে কষ্ট, তা আমরা লাঘবের চেষ্টা করছি। গ্রেপ্তারের পর দুই ভাইকে আদালতের মাধ্যমে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। বাকি ২ লাখ টাকাসহ বৃদ্ধের বড় ছেলে হানিফকে ধরার চেষ্টা চলছে। হানিফের স্ত্রীও পলাতক।