জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট বাংলাদেশ সফরের প্রথম দিন গতকাল রোববার মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মানবাধিকারবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যাপারে জোর দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মানবাধিকার পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন। দুই মন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানিয়েছেন, যারা গুম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে তাদের অনেকে পালিয়েছে, অনেকে আত্মগোপন করেছে। বাংলাদেশে তিন কারণে মানুষ নিখোঁজ হয়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত হওয়ার পর শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য, ব্যবসায় লোকসান করলে কিংবা পারিবারিক কারণে মানুষ নিখোঁজ হয়।

গতকাল সকালে মিশেল ব্যাচেলেট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এরপর দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ও পরে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি।

বৈঠকের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের জানান, মিশেল ব্যাচেলেটের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘকে একটি প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। প্রস্তাব এলে বিষয়টি বিবেচনা করে দেখা হবে। বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, আলাপ হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশ নিয়ে। তিনি বলেন, 'লেখক মোশতাক আহমেদকে (কারাগারে মারা যাওয়া লেখক মোশতাক আহমেদ) নিয়েও কথা হয়েছে। তাঁকে নিয়ে মিশেল ব্যাচেলেট প্রশ্ন করলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পড়ে শুনিয়েছি। তারপর তিনি আর প্রশ্ন করেননি।' মিশেল ব্যাচেলেটকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ মানবাধিকার বিষয়ে খুবই গুরুত্ব দেয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে মিশেল ব্যাচেলেট উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কিনা- জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, এটা আলোচনায় এসেছে। এ নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেননি।

এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, তিনি জানিয়েছেন, জোরপূর্বক গুম বলে বাংলাদেশে কোনো শব্দ নেই। ৭৬ জনের গুমের তালিকার কথা বলা হলেও তাদের মধ্যে আবার ১০ জন ফিরে এসেছে। বাকিদের বিষয়ে জানি না। তবে তাদের পরিবার কোনো তথ্য দেয় না। আমরা জানতে চাই, তারা কোথায় গিয়েছেন?

তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা আগে হলেও এখন নেই। বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে কোনো তথ্য পেলে সরকার তা তদন্ত করবে। বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে আমরা নিজে থেকে বলেছি। বাংলাদেশে আগে ২০০৩, ২০০৪ ও ২০০৫ সালের দিকে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যেত। এভাবে মৃত্যু এখন আর নেই। আমি গত পাঁচ-ছয় বছর দেশে রয়েছি, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যাওয়ার কোনো গল্প শুনিনি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর পুলিশ হাজারখানেক লোক মেরে ফেলে।'

আলোচনায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, 'জাতিসংঘের ধারণা, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কোনো স্বাধীনতা নেই। আমি বলেছি, আমার এমন কিছু জানা নেই। আমি তো দেখি, আমাদের গণমাধ্যম খুবই শক্তিশালী।' দেশে সুশীল সমাজের প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, 'দেশে সুশীল সমাজ নাকি নেই। সুশীল সমাজ তো সব জায়গায় থাকে। এনজিও আমাদের দেশে শত শত, কয়েক হাজার।' তিনি জানান, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জাতিসংঘ খুব উদ্বিগ্ন এবং এ সমস্যা সমাধানে তারা সহযোগিতা করবে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ঘৃণ্য অপরাধ যারা করেছে, পুলিশকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, তারা সীমান্তের ফাঁকফোকর দিয়ে বিভিন্ন দেশে চলে গেছে। গুমের তালিকার ৭৬ জনের মধ্যে ১০ জন তাঁদের বাড়িতেই আছেন। দু'জন আছেন জেলখানায়। গুমের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন সরকারের কাছে গুম হওয়া যে ৭৬ ব্যক্তির তালিকা দিয়েছিল, তাঁদের ব্যাপারে মিশেল ব্যাচেলেটকে অবগত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারকে জানিয়েছেন বাংলাদেশে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি নতুন পাঠ্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম, মেয়ে শিক্ষার্থীদের ভাতা প্রদান এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষা নিশ্চিতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর বিষয় তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অধিকার নিশ্চিতের বিষয়েও জানান তিনি।

সফরের দ্বিতীয় দিন আজ সকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে শ্রদ্ধা জানাবেন মিশেল ব্যাচেলেট। এরপর ঢাকার পশ্চিমা দূতাবাসগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সফরকালে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাবেন তিনি। ১৭ আগস্ট সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এদিনই তিনি সফরের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করবেন।