জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর ৬ আগস্ট নগর পরিবহন ও দূরপাল্লার বাসের ব্যয় বিশ্নেষণ করা হয়। পরে নগর পরিবহনে কিলোমিটারপ্রতি ৩৫ পয়সা এবং দূরপাল্লার পথে ৪০ পয়সা করে ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাস ও লঞ্চে ভাড়ার পরিমাণ কত বাড়তে পারে তার একটি ধারণা দেয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। তাদের তথ্যমতে, প্রতি কিলোমিটারে বাস ভাড়া সর্বোচ্চ ২৯ পয়সা আর লঞ্চে ৪২ পয়সা বাড়তে পারে। যদিও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের হিসাবের চেয়ে দূরপাল্লায় কিলোমিটারপ্রতি ১৩ পয়সা এবং নগরে কিলোমিটারে ৬ পয়সা করে বেশি ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা দেয় বিআরটিএ। বাসের ভাড়া ঠিক করে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ। সরকারের একটি মন্ত্রণালয়ের করা হিসাব তাহলে পাল্টে গেল কেন? এখানেই শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে।

আমরা সবাই জানি, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে চলাচলকারী অধিকাংশ বাসই লক্কড়-ঝক্কড়। গণপরিবহন মালিকরা ভাড়া নির্ধারণে এসব বাসের মূল্য ধরেন গড়ে ৩৫ লাখ টাকা। ব্যাংক ঋণে কেনা এসব বাসের সুদ পরিশোধ ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ১০ লাখ টাকা। পাশাপাশি নিবন্ধন ফি ৪২ হাজার টাকা। এসব মিলিয়ে প্রতিটি বাসের পেছনে গড় বিনিয়োগ ব্যয় পড়েছে প্রায় ৪৬ লাখ টাকা। সারাদেশে দূরপাল্লার রুটগুলোয় চলে বিভিন্ন মানের বাস। তবে এসব (নন-এসি) বাসের মূল্য ধরা হয়েছে ৭৫ লাখ টাকা। ব্যাংকঋণে কেনা এসব বাসের জন্য সুদ পরিশোধ করতে হবে সাড়ে ২২ লাখ টাকা। সঙ্গে যুক্ত হবে নিবন্ধন ফি। এতে প্রতিটি দূরপাল্লার বাসের পেছনে বিনিয়োগ ব্যয় পড়েছে প্রায় ৯৮ লাখ টাকা। শুধু বাসের দামই নয়, ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে বীমা খরচ, টোল খরচ, প্রতি মাসে টায়ার-টিউব পরিবর্তন, ছয় মাসে দুটি ব্যাটারি বদল, নিয়মিত বাসের রক্ষণাবেক্ষণ, প্রতি পাঁচ বছরে বাস রেনোভেশন করা ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ধরা হয়েছে। এ ছাড়া বাসের গ্যারেজ ভাড়া, ভবিষ্যতে দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতিও দেখানো হয়েছে ভাড়া নির্ধারণে। এভাবেই ১৬টি খাতে ব্যয় যোগ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতি কিলোমিটার নগর পরিবহনে কিলোমিটারপ্রতি ৩৫ পয়সা এবং দূরপাল্লার পথে ৪০ পয়সা বাড়িয়ে বাস ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ভাড়ার নামে মূলত বোঝা চেপেছে যাত্রীদের কাঁধে।

বিআরটিএ ব্যয় বিশ্নেষণ করে প্রতিটি বাসের গড় আয়ুস্কাল ধরেছে ১০ বছর। বাসগুলো বছরে চলবে ৩০০ দিন। আসনের ৯৫ শতাংশ যাত্রী বহন করবে বাসগুলো। যদিও অধিকাংশ সময় আসনের চেয়ে দ্বিগুণ যাত্রী বহন করে বাসগুলো। তবে ৯৫ শতাংশ যাত্রী বহন দেখিয়ে ভাড়া নির্ধারণ করায় কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বেশি পড়েছে। হিসাবে প্রতিটি বাসে গড়ে প্রতি মাসে টায়ার-টিউব পরিবর্তন করায় বছরে ব্যয় ধরা হয়েছে তিন লাখ ১২ হাজার টাকা। এর বাইরে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ইঞ্জিন ওভারহোলিং না করা হলেও বছরে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে চার লাখ ৬৮ হাজার টাকা। সাধারণত বীমা না থাকলেও ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের কোনো ধরনের টোল না থাকলেও এ খাতে বছরে ২৫ হাজার ৬০০ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। মহাসড়কে চলাচলকারী বাসগুলো রংচটা ও লক্কড়-ঝক্কড় হলেও পাঁচ বছরে এগুলো রেনোভেশনের জন্য বছরে গড়ে ধরা হয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। আবার দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে বছরে ৬৫ হাজার টাকা এবং বাসের গ্যারেজ ভাড়া ৬৫ হাজার টাকা।

এদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে চলাচলকারী বেশিরভাগ বাসেই ব্যয় বিশ্নেষণে চালকের বেতন দৈনিক ১ হাজার টাকা, ভাড়া আদায়কারীর ৭০০ এবং চালকের সহকারীর বেতন ৪০০ টাকা। কিন্তু ঢাকা ও চট্টগ্রামের কোনো বাস সাধারণত এভাবে বেতন দিয়ে পরিচালিত হয় না। দৈনিক ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায় চুক্তিতে এসব বাস চালান চালকরা। জ্বালানি খরচ, চাঁদা মিটিয়ে বাড়তি যা থাকে, তা ভাগ করে নেন চালক, ভাড়া আদায়কারী ও সহকারী। এজন্য বাড়তি আয়ের আশায় পরিবহনচালকরা কার আগে কে যাত্রী তুলবেন, এ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। এটাকে নগরে সড়ক দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্যয় বিশ্নেষণে বলা হয়েছে, বছরে দুবার শ্রমিকদের ৪০ হাজার টাকা বোনাস দেওয়া হয়। আদতে নগর পরিবহনে বোনাসের কোনো ব্যবস্থাই নেই। বরং ঈদ এলে পরিবহন শ্রমিকরা বোনাসের নামে যাত্রীদের কাছ থেকে দু-তিন গুণ বেশি ভাড়া আদায় করেন। অনেক নগর পরিবহনের বাস দূরপাল্লার পথে বাড়তি ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করে। দূরপাল্লার পথে বাসের চালক, সুপারভাইজার ও সহকারীর পেছনে বছরে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ হয় বলে ব্যয় বিশ্নেষণে দেখানো হয়েছে। তবে বড় কিছু কোম্পানি বাদ দিলে দূরপাল্লার পথেও মালিকরা বাস চুক্তিতে চালান। বছরে দুটি ব্যাটারি বাবদ ৪০ হাজার টাকা ব্যয় যুক্ত হয়েছে। এর সঙ্গে বছরে একটি ইঞ্জিন কুল্যান্ট কেনায় ব্যয়। 

ব্যয় বিশ্নেষণের সময় ১২টি বিষয় আমলে নেওয়া হয়। আর ১৬-২০টি ব্যয়ের খাত চিহ্নিত করে এগুলোতে বছরে কত টাকা খরচ হয়, তা বের করা হয়। এর সঙ্গে ১০ শতাংশ মুনাফা যোগ করে প্রতি কিলোমিটারে কত ব্যয় হয়, সেটা বের করা হয়। কিন্তু গণপরিবহন মালিকদের কথামতো ব্যয় বিশ্নেষণ হিসাবের সময় প্রতিটি বাসের ট্রিপে কত যাত্রী হয়, বাসের বাজার মূল্য কত, বাসটি কত পথ পাড়ি দেয়- এসব কখনোই সরেজমিনে যাচাই-বাছাই না করে বিআরটিএ একটি অঙ্ক বসিয়ে দেয়। যা মূলত গণপরিবহন মালিকদের স্বার্থই নিশ্চিত করে। কিন্তু পরিবহন খাতে যে চাঁদাবাজি হয়, সেই হিসাবটা ব্যয় বিশ্নেষণে আসে না। এই চাঁদার মধ্যে রয়েছে মালিক সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় মাস্তানের ভাগ।

ভোক্তা ও গণপরিবহন খাতের সংশ্নিষ্টদের মতে, বাস ভাড়া নির্ধারণে ব্যয় বিশ্নেষণের মধ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। বিআরটিএ ব্যয় বিশ্নেষণের সময় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বাসের অন্যান্য ব্যয় ও বিনিয়োগেরও বিশ্নেষণ করেছে। যদিও প্রতিবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর নানা গোঁজামিলের ব্যয় যোগ করে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের মুখ্য ভূমিকা থাকে। এ ক্ষেত্রে বাস পরিচালনায় যেসব খাতের ব্যয় আমলে নেওয়া হয়, সেগুলোয় যাত্রীদের নয়, গণপরিবহন মালিকদের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। 

ভোক্তারা দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক গোষ্ঠী হলেও নীতিনির্ধারণীতে তাঁদের ভূমিকা গৌণ। তাই সরকারকে সত্যিকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে ভোক্তা স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে। বিশেষ করে সরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক জবাবদিহিতাকে নাগরিক তদারকি ও পরিবীক্ষণের আওতায় আনতে হবে। নাগরিক অধিকার, স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয়ে নিয়োজিত জাতীয়-আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ভোক্তা অধিকার ও নাগরিক সংগঠনগুলোকে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি নাগরিক স্বার্থসংশ্নিষ্ট সরকারি কমিটি, গণপরিবহন সেক্টরে জড়িত মালিক-শ্রমিক ও ভোক্তাদের (যাত্রী) নীতিনির্ধারণীতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এসব নাগরিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাড়ি ভাড়া, হোল্ডিং ট্যাপ, নগর ব্যবস্থাপনা, শিল্প-বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ে নাগরিক ভোগান্তি নিরসনে গ্রাহক, সেবাদানকারী সংস্থা ও ভোক্তা প্রতিনিধি, প্রশাসনের সমন্বয়ে ত্রিপাক্ষিক গণশুনানির মাধ্যমে নাগরিক পরিবীক্ষণ, অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে সুশাসন জোরদার করতে হবে। তাহলেই দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী-ভোক্তার প্রতি সুবিচার নিশ্চিত হবে।