রাজধানীতে এক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড কেবল বিপৎগামী কিছু সেনা সদস্যের কাজ ছিল না, এর পেছনে বিদেশি রাষ্ট্র এবং গোয়েন্দা সংস্থারও হাত ছিল। নির্মম সেই হত্যাকাণ্ডের জন্য যাঁরা কেবল কয়েকজন সেনা সদস্যের বিপৎগামিতাকে দায়ী করেন, তাঁরা প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে ইতিহাস চর্চায় ব্যস্ত। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অপরাধীরাও এক দিন শনাক্ত হবেই।

গতকাল বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস আয়োজিত 'বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখা: তার সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণ' শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন মহান নেতার কয়েকজন সহকর্মী। বিআইডিএস মিলানয়তনে এ অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন, বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে ঢাকায় পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালন করা মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী সাজ্জাদ আলী জহির প্রমুখ বক্তব্য দেন।

ড. মসিউর রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পেছনে বিদেশি ষড়যন্ত্র ছিল কিনা, নাকি এটা কেবল কতিপয় বিপৎগামী সেনা সদস্যের কাজ তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর অনেক প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা অত্যন্ত সাহসী একটা সিদ্ধান্ত ছিল। বঙ্গবন্ধু মনে করতেন প্রশাসন আর রাজনীতি পরস্পর প্রতিপক্ষ নয়, সহযোগী। দু'পক্ষের প্রচেষ্টায় দেশ এগিয়ে যায়। উন্নয়নের স্বার্থে তাঁর সময়েই প্রথম ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশ রুরাল ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিআরডিবি) মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের মাধ্যমে গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম শুরু হয়।

ড. মসিউর বলেন, স্বাধীনতার পর বিশ্বব্যাংকের ঋণ পেতে চাইলে সংস্থার পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হয়, স্বাধীনতার আগে নেওয়া ঋণের আংশিক দায় নিতে হবে বাংলাদেশকে। বঙ্গবন্ধু সেই শর্ত প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেছিলেন, এ দেশের মানুষ না খেয়ে থাকলেও এ ধরনের শর্ত মেনে নেবে না। একইভাবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত ছিল, টাকার দর ৩৫ শতাংশ সমন্বয় করতে হবে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, মৌসুমের নতুন ফসল উঠার আগে এসবের কিছুই করা হবে না।

বিনায়ক সেন বলেন, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোনো কোনো বিবৃতিতে সিআইএকে দায়ী করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের হাত থাকতে পারে। বিশ্বে ইন্দিরা গান্ধীসহ অনেক বিশ্ব নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে তাঁদের পরিবারের কাউকে মারা হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা এ রকম একমাত্র ঘটনা। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে যে মনোভঙ্গি কাজ করেছে, তা বিরল।

মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, পাকিস্তান পরাজিত হওয়ার কারণে দেশটির প্রভুরাও পরাজিত হয়েছে। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি। এ কারণে বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্র করা হয়েছে কীভাবে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দেওয়া যায়। তারা সেনাবাহিনীর মধ্যে কলহ সৃষ্টি করেছে। বিদ্রোহীদের একত্র করেছে। কৃত্রিম খাদ্য সংকট তৈরি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ করা হয়েছে।

সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, আব্দুস সাত্তার মণ্ডল, কাজী ফারুক ও ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ।