অতিমারি করোনার যে চোট দেশের মৎস্য, পোলট্রি ও ডেইরি খাতে লেগেছিল, তা সারাতে পারেননি উদ্যোক্তারা। সঙ্গে প্রাণিজ খাবারের আগুন-দাম সেই ক্ষতে ধরিয়েছিল জ্বালা। এর মধ্যেই গত নভেম্বরে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ায় একরকম খুঁড়িয়ে হাঁটছিল খাতটি। আগস্টের শুরুতে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দর আকাশ ছোঁয়ায় মহাবিপর্যয় নেমেছে মৎস্য, পোলট্রি ও ডেইরি খাতে। এর প্রাথমিক প্রভাব পড়েছে বাজারে। বেড়েছে খাত-সংশ্নিষ্ট সব পণ্যের দাম। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় টিকতে না পেরে এরই মধ্যে ব্যবসা গুটিয়েছেন বহু উদ্যোক্তা। এ পটভূমিতে মাছ, মুরগি, ডিম ও দুধের দাম লাগামহীন হওয়ায় স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় বড় বিপদ ধেয়ে আসছে বলে মনে করছেন বিশ্নেষকরা। প্রাণিজ আমিষ থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে সরে যাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা।

উদ্যোক্তারা বলছেন, দৈনিক ৮-১০ ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের কারণে পোলট্রি বাচ্চা, মাংস ও ডিমের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে সরবরাহে ঘাটতি। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের রেকর্ড দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে বাড়তি উৎপাদন ও পরিবহন খরচ যুক্ত হয়ে হুহু করে বাড়ছে মুরগি, ডিম ও মাংসের দাম। বড় উদ্যোক্তারা বলছেন, ডলার, জ্বালানি তেল ও প্রাণিজ খাদ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি মুরগি-ডিমের আগুন-দামের পেছনে কিছু সিন্ডিকেটও রয়েছে সক্রিয়। এ ব্যাপারে সরকারের তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে খামার থেকে পণ্য এনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকার বলছে, মাছ-মাংস-ডিমের দাম সহনীয় রাখতে তারা কাজ করছে। দ্রুতই দাম কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে আসবে। প্রয়োজনে ডিম আমদানি করা হবে। তবে ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে ডিম আমদানি নয় বরং পোলট্রি শিল্পের সংকট দূর করার উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
বড় সংকটে পোলট্রি খাত :নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরজব্বারের তরুণ উদ্যোক্তা মহিব উল্যাহ বছর দুয়েক আগে শুরু করেন পোলট্রি ব্যবসা। বাচ্চা কিনে বড় করে তিনি বেচেন। ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে করোনার সময় থেকেই তিনি লোকসান
গুনছেন। ঠকতে ঠকতে ৯ আগস্ট তিনি ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে এ উদ্যোক্তা বলেন, 'একের পর এক ধাক্কা সামলাতে পারছিলাম না। লোডশেডিংয়ের কারণে দৈনিক ১০-১২ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে হচ্ছিল। এখন জ্বালানির অস্বাভাবিক দরের সঙ্গে আর টিকতে পারলাম না। ব্যাংক ঋণ কীভাবে শোধ করব- তা ভেবে চোখে আঁধার দেখছি।' তিনি জানান, কাঁচামাল, ডলার ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় খামার পর্যায়ে ব্রয়লার মুরগির কেজিতে উৎপাদন খরচ ১৪৫-১৫০ টাকা ও ডিমের খরচ পড়ছে অন্তত ১০ টাকা।

ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি সপ্তাহে ১ কোটি ৩০ লাখ ব্রয়লার বাচ্চার চাহিদা রয়েছে, যার পুরোটাই সরবরাহ করেন ব্রিডার বা স্থানীয় হ্যাচারি মালিকরা। ডিম থেকে বাচ্চা তৈরিতে ইনকিউবেটরসহ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকক্ষে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। চলমান লোডশেডিংয়ের কারণে ব্রয়লারের বাচ্চা উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে বাচ্চার উৎপাদন খরচ বেড়েছে ২.৫ থেকে ২.৭৫ টাকা।

ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি কাজী জাহিন হাসান বলেন, প্রতি সপ্তাহে ৫০ লাখ মুরগির বাচ্চার উৎপাদন কমে গেছে। ভোক্তার কেনার সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ৪০ শতাংশ কমেছে ব্রয়লার মুরগির বিক্রি।
ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান বলেন, 'কখনও কখনও ২০ ঘণ্টাও লোডশেডিং হচ্ছে। বাচ্চা যদি সঠিক সময়ে তাপমাত্রা না পায়, তাহলে সমস্যা হয়। এতে বাচ্চা দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন নানা রোগও দেখা দেয়। শুধু ডিজেলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি পিস ডিমের উৎপাদন ব্যয় ২৫ থেকে ৫০ পয়সা এবং একটি বাচ্চার খরচ ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে যাচ্ছে।'

উদ্যোক্তাদের হিসাবে, প্রতি মাসে সোয়া ৫ লাখ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টন পোলট্রি খাবারের চাহিদা রয়েছে দেশে। চাহিদার শতভাগই আসে দেশি ফিডমিল থেকে। কাঁচামালের দাম বাড়ায় গেল এক বছরে প্রাণিজ খাবারের উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। চাপ রয়েছে ডলারের দাম বাড়ায়ও। তার পরও বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে লোডশেডিং ও জ্বালানি তেলের দাম।

উদ্যোক্তাদের হিসাবে ব্রয়লার মুরগির প্রতি কেজি মাংস উৎপাদনে খরচ ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর সঙ্গে পরিবহনসহ অন্য খরচ মিলিয়ে ঢাকার আড়তে এখন মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়, যা খুচরা বাজারে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৩৩৫.৩৫ কোটি পিস ডিম উৎপাদন হয়েছে। ১০ বছরের মধ্যে এই উৎপাদন তিন গুণের বেশি বেড়েছে। তবে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) তথ্য বলছে, স্বাভাবিক সময়ে পোলট্রি সেক্টরে দিনে ৪ কোটি পিসের বেশি ডিম উৎপাদন হয়েছে। করোনার আগে খামার পর্যায়ে প্রতি কেজি ব্রয়লার মাংস উৎপাদনে খরচ হতো ৯০ থেকে ১০০ টাকা। সম্প্রতি এটি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার বিশ্নেষণের তথ্য বলছে, এক মাসের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ৩৯.২৯ শতাংশ এবং ডিমের দাম হালিতে ২৮.৫ শতাংশ বেড়েছে।

এদিকে গবাদি পশুর খামারিরাও কম বিপদে নেই। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ ইমরান বলেন, গবাদি পশুর জন্য প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সব পণ্যের দাম বেড়েছে। লোডশেডিং ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে। প্রতিদিন ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম বাড়লেও গরুর মাংস ও দুধের দাম বাড়ছে না। তিনি বলেন, মাংসের দাম স্বাভাবিক রাখতে হলে ভালো জাতের পশু আমদানির সুযোগ দিতে হবে। এ খাতে খরচ বেড়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি। সারাবিশ্বে পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে ১০ শতাংশ। তবে আমাদের দেশে বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

মাছ শিকারেও ধাক্কা :দেশের মোট চাহিদার বড় একটি অংশের জোগান দেয় সামুদ্রিক মাছ। হঠাৎ ডিজেলের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ায় খরচ বাড়ে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে। এর প্রভাব পড়েছে মাছের দামেও। মেরিন হোয়াইট ফিশ ট্রলারস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি ছৈয়দ আহমেদ বলেন, আমাদের স্টিল বডি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর প্রতি ট্রিপে সাগরে মাছ শিকারে যেতে ৬০ থেকে ৮০ টন পর্যন্ত ডিজেল নিতে হয়। ১৮০০ হর্স পাওয়ারের ট্রলারগুলোতে ১০০ টনের মতো ডিজেল লাগে। এখন ৮০ টাকার ডিজেল ১১৪ টাকা হয়েছে। এতে যাদের ১০০ টন তেল লাগে, তাদের প্রায় ৩৪ লাখ টাকা এক ট্রিপেই খরচ বেড়ে গেছে। সে হিসাবে বাজারে মাছের দাম পাওয়া যাবে না। আবার মাছের দাম বাড়লেও তা সাধারণ ভোক্তাদের ওপর প্রভাব পড়বে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশের সীমানায় মৎস্য শিকার করে প্রায় ৬৮ হাজার নৌযান। এর মধ্যে প্রায় ৩৩ হাজার নৌযান রয়েছে ইঞ্জিনচালিত। এসব নৌযানের মাধ্যমে বছরে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টন মাছ আহরণ করা হয়, যা আহরিত সামুদ্রিক মাছের ৮১.৬৬ শতাংশ।

ডিম আমদানির বিকল্পও আছে :উদ্যোক্তারা বলছেন, ডিম আমদানি করলে খামারিরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, ডেইরি, মৎস্য ও পোলট্রি খাতে প্রায় একই রকম খাবার ব্যবহার হয়। প্রাণিজখাদ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে ভোক্তা ভুগছেন। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে তিনটি কাজ করতে পারলেই পণ্যের দাম ২০-২২ শতাংশ কমে যাবে। প্রাণিজ খাবারের অন্যতম কাঁচামাল সয়ামিল রপ্তানি বন্ধ, এ খাতে ব্যবহূত সব পণ্যের আমদানি শুল্ক্ক প্রত্যাহার এবং মাংস ও হাঁড়ের তৈরি প্রোটিনসমৃদ্ধ প্রানিজ খাবার (মিট বোন মিল) আমদানি শুরু করতে হবে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, এখন সংকট চলছে। একদিকে যেমন দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করতে হবে; অন্যদিকে পুষ্টিকর খাদ্য ডিম, দুধ, মাছ ও মাংসের উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রাখতে হবে। হুট করে ডিম আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। সবকিছু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে।

নাহার এগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুর রহমান বলেন, দ্রুত পোলট্রি বোর্ড গঠন করে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। কী করা যায় বা কী করা উচিত- সেই নীতি এখনই ঠিক করতে না পারলে ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংস হয়ে যাবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, পোলট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাতের উন্নয়নে যত ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা দেওয়া দরকার, সরকার সেটা করছে। করোনাকালেও এ খাত সংকটে পড়েছিল। প্রণোদনা ও ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রিসহ নানা কর্মসূচির কারণে খামারিরা ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছেন। সাম্প্রতিক সমস্যা সমাধানেও সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।


বিষয় : পোলট্রি-ডেইরি

মন্তব্য করুন