সারাদেশে এডিস মশার জীবাণুবাহী ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে গত ১৬ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১২৮ জন। পরদিন ১৭ আগস্ট ভর্তির সংখ্যা ছিল ৯৮। গত ১৮ আগস্ট ভর্তি হয়েছেন ৯৩ জন। চলতি বছরের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১৭ জন। করোনার প্রকোপ কিছুটা কমলেও এ সময়ে ভয়ংকর হয়ে উঠছে ডেঙ্গু। প্রতি মাসেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সময় অভিযান-চিরুনি অভিযান ও সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম হাতে নিলেও তা খুব একটা কাজে আসছে না। প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার খবর আসছে। এসব রোগীর সিংহভাগই রাজধানী ঢাকার। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে আজ শনিবার পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব মশক দিবস।

সিটি করপোরেশনসহ সংশ্নিষ্ট দপ্তর ও সংস্থা কেন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না, সে প্রসঙ্গে মশক বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সমকালকে বলেন, আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে যে এডিস মশার প্রভাব বাড়বে, সেটা আমরা আগেই ধারণা দিয়েছিলাম। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এ জন্য কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল। কিন্তু কাজ কী হয়েছে, সেটা ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। আমরা ফলাফল যদি ভালো না পাই, তাহলে বুঝতে হবে, কাজটি ঠিকমতো হয়নি। কীভাবে করলে ভালো ফল আসবে, সে জন্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে আর এমনটি না হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে শামসুল কবির সমকালকে বলেন, ডেঙ্গু যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে, এ জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে, অঞ্চলে অঞ্চলে মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। যেসব এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেসব এলাকায় বিশেষ কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সেখানে মেয়র প্রতিদিন দু'বার বসছেন। তিনি আরও বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু অনেক নিয়ন্ত্রণে আছে। এখন ডেঙ্গুর ভরা মৌসুম। আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে এটা কমতে শুরু করবে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে যে তালিকা দেওয়া হচ্ছে, তা ভুলে ভরা। একই ফোন নম্বর দেওয়া হচ্ছে সাত-আটজন রোগীর নামে। আমরা তালিকা বাছাই করে প্রতিদিন ১৫-২০ জন রোগী পাচ্ছি। এ রকম তালিকার কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানোতেও বিঘ্ন ঘটছে। তবে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রায় একই কথা বলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কর্মকর্তারা।

তাঁরা বলছেন, ডিএনসিসির পক্ষ থেকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিনই তাদের কার্যক্রম মনিটর করা হচ্ছে। কিন্তু যে সংখ্যক রোগী ঢাকায় দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে তা ঠিক নয়। এর মধ্যে অনেক বাইরের রোগীও ঢাকার তালিকায় দেখানো হচ্ছে।

ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ডিএনসিসি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে নগরবাসীর সহযোগিতা বেশি প্রয়োজন। প্রতি শনিবার বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। নগরবাসীকে আমরা অনুরোধ করছি, প্রতিদিন সকাল ১০টায় এক ঘণ্টার জন্য যেন তাঁরা তাঁদের বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিস্কার করেন। যেসব স্থানে পানি জমার সুযোগ থাকে, সেগুলো যেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ডাবের খোসা, ক্যান, টায়ার, বাসার ছাদ, ফুলের টব, এসি-ফ্রিজের পানি- এগুলো যেন কোথাও তিন দিন জমতে না পারে সে আহ্বান আমরা জানাচ্ছি। কিছু কাজ আছে, যা মানুষের ঘরের ভেতরে গিয়ে করা সম্ভব নয়। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদেরও কেউ ঘরের ভেতরে ঢুকতে দিতে চায় না। বিভিন্ন কারণেই নগরবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন।

প্রতি বছর ২০ আগস্ট বিশ্বজুড়ে মশক দিবস পালন করা হয়। এই দিনটি ভারতীয় বংশোদ্ভূত চিকিৎসাবিজ্ঞানী স্যার রোনাল্ড রসের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গকৃত। স্যার রোনাল্ড রস ১৮৯৭ সালের ২০ আগস্ট প্রথম প্রমাণ করেন, একমাত্র স্ত্রী মশা মানুষের দেহে ম্যালেরিয়ার জীবাণু ছড়ায়। বিশ্বে হাজারেরও বেশি প্রজাতির মশা রয়েছে। এর মধ্যে কিছু ক্ষতিকারক স্ত্রী মশা মানুষের রক্ত পান করে পুষ্টিক্রিয়া সাধন করে। তখনই মানুষের দেহে ভয়ংকর জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। রোনাল্ড রসের (১৮৫৭-১৯৩২) প্রতি সম্মান জানাতেই যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন ১৯৩০ সালে দিবসটি পালন শুরু করেছিল। পরবর্তী সময়ে বিশ্ব মশক দিবসের আনুষ্ঠানিকতা দিন দিন বাড়তে থাকে। এই আবিস্কারের জন্য পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা শাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান রোনাল্ড রস। মশক দিবস উপলক্ষে বিগত বছরগুলোতে সরকার ও সিটি করপোরেশনেরও কোনো বিশেষ কর্মসূচি ছিল না। এবারও কোনো কর্মসূচি নেই।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোবায়দুর রহমান সমকালকে বলেন, আমরা এটা করি না। প্রায় একই কথা বলেন ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে শামসুল কবির। তিনি বলেন, কর্মসূচি পালন মূল লক্ষ্য নয়। তাঁদের লক্ষ্য মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা।

আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে রাজধানীসহ সারাদেশে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৬৩ জন। জুন মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩৭ জনে। জুলাই মাসে হয় ১ হাজার ৫৭১ জন। চলতি মাসের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪২১ জন। জুনে মারা যান ১ জন। জুলাইয়ে ৯ জন। আগস্ট মাসে মারা গেছেন ৭ জন। ১ জানুয়ারি থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ১৭৪ জন। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৭৬ জন। এছাড়া গত ১৮ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে ৮১ জনই রাজধানী ঢাকার। ১৭ আগস্ট ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে ৭৭ জনই ঢাকার। ১৬ আগস্ট ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে ১০৮ জনই রাজধানীর। এক কথায় রাজধানীর ৪৭টি হাসপাতালসহ সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি ডেঙ্গু রোগী ঢাকার।