আশরাফুল আলম পল্টনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ৮-১০ জন তুলে নিয়ে যায়- পরিবারের এমন অভিযোগে অপহরণের ঘটনা ধরে তদন্ত শুরু করে গাজীপুরের টঙ্গী থানা পূর্ব। এতেই শর্ষের মধ্যে ভূত বেরিয়ে আসে। অপহরণ নয়, পল্টনকে মাদক কারবারির অভিযোগে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। শুধু তাই নয়, ছেড়ে দেওয়ার জন্য অর্থ চাইলে বিকাশের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা দেয় পরিবার। কিন্তু পল্টন ছাড়া পাননি। এরপরই পুলিশ তৎপর হলে টাকা হজম করতে পারেননি ডিএনসির সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা। ছয় দিন পর ভুুক্তভোগীর পরিবারকে টাকা ফেরত দিয়েছেন তাঁরা।

গত ১৪ জুলাই পল্টনকে আটকের এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিএনসি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কার্যালয়ের মতিঝিল সার্কেলের পরিদর্শক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। সঙ্গে ছিলেন সহকারী পরিচালক সুব্রত সরকার শুভ, সহকারী উপপরিদর্শক মোহাম্মদ হোসেন, সিপাহি সোহাগ সূত্রধর, জাহিদুল ইসলাম, জহিরুল ইসলাম, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর হোসেন ও সাময়িকভাবে নিয়োজিত ডিএমপির দুই কনস্টেবল।

বিষয়টি জেনেও সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ডিএনসি। উল্টো ওই অভিযানে থাকা ব্যক্তিদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন ডিএনসি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কার্যালয়ের উপপরিচালক মাসুদ হোসেন। তিনি সমকালকে বলেন, টিমের কেউ টাকা নেননি। শুনেছি সোর্সের মাধ্যমে বিকাশে ওই টাকা এসেছিল। আভিযানিক দলের হেফাজতে থেকে পল্টন স্ত্রীকে ফোন করে বলেছিলেন, স্যাররা টাকা পেলে ছেড়ে দেবেন। হেফাজতে থেকে ফোন করার পরও এর মধ্যে সোর্স এলো কীভাবে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, এমন কিছু ঘটে থাকলে, যাচাই করে দেখা হবে।

অভিযোগের বিষয়ে মিজানুর রহমান বলেন, 'আসামি ধরে আনার পর অন্য কোনো দিক দিয়ে টাকার বিষয়টি হলেও হতে পারে। আমরা টাকা নিলে তো আসামিকে ছেড়ে দিতে পারতাম। বিষয়টি এমন নয়। টঙ্গীর বাসা থেকে ৫০০ ইয়াবা, নগদ ১৯ হাজার ২০০ টাকাসহ পল্টনকে আটক করি। পরে শাহবাগ থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনি এখন কারাগারে।'

মিজানুর রহমান এর আগে ডিএনসি ফরিদপুর জেলা কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। সেখানেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযানের নামে আসামির বাড়ি থেকে ৬০ হাজার টাকা ও স্বর্ণালংকার আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। আসামিপক্ষের অভিযোগের পর ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক ডিএনসির ফরিদপুর জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক শামীম আহমেদকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেন। শামীম আহমেদ সমকালকে বলেন, মিজানুর রহমানসহ ওই আভিযানিক দলের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। অবশ্য মিজানুরের দাবি, অভিযোগ এমন বিষয়, চাইলে যে কারও বিরুদ্ধে করা যায়।

মিজানুর ছাড়াও আভিযানিক দলের সদস্য সুব্রত সরকার শুভর বিরুদ্ধে ডিএনসির ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কার্যালয়ে থাকাকালে নানা অভিযোগ ওঠে। এক পর্যায়ে তাঁকে ডিএনসির প্রধান কার্যালয়ে বদলি করা হয়।

টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি জাবেদ মাসুদ সমকালকে জানান, পল্টনের ভাই লিটন থানায় এসে তুলে নেওয়া এবং বিকাশে ১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার কথা জানান। অপহরণের ঘটনা ধরেই আমরা তদন্ত শুরু করি। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গেণ্ডারিয়ায় ডিএনসি কার্যালয়ের পাশে বিকাশের দোকানটি শনাক্ত করা হয় এবং পুলিশের জেরায় ওই দোকানের মালিক জানান- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা তাঁর নামে টাকাগুলো আসবে বলেছিলেন। পরে জেনেছি, পল্টনকে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সেই টাকা পরিবারকে ফেরত দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, টঙ্গীর মধ্য আরিচপুরের মসজিদ রোডের সানমুন টেলিকম থেকে বিকাশের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা পাঠান পল্টনের স্বজনরা। সানমুন টেলিকমের মালিক সহিদুল ইসলাম সমকালকে টাকা পাঠনোর রেজিস্টার খাতা দেখান। তিনি জানান, পুলিশ একাধিকবার টাকা পাঠানোর বিষয় যাচাইয়ে তাঁর দোকানে এসেছে। রেজিস্টার খাতায় দেখা যায়, সংশ্নিষ্ট একটি নম্বরে ১৪ জুলাই চার দফায় ২৫ হাজার করে মোট ১ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে। একইভাবে ২০ জুলাই ওই নম্বর থেকে ২৪ হাজার ৫০০ টাকা করে ৯৮ হাজার টাকা ফেরত এসেছে। বিকাশ ২ হাজার টাকা চার্জ নিয়েছে।

সহিদুল ইসলাম বলেন, টঙ্গী পূর্ব থানার (সম্প্রতি বদলি) এসআই হুমায়ন কবির ২০ জুলাই ফোন করে বলেন- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাকে বিকাশ করা ১ লাখ টাকা ফেরত আসবে। টাকাগুলো পল্টনের ভাই লিটনকে দিয়ে দেবেন।

গত ১৭ জুলাই মাদক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান টঙ্গীতে এসআই হুমায়ন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানা গেছে।

পল্টনের ভাই সাজেদুল আলম লিটন সমকালকে বলেন, 'আমরা প্রথমে অপহরণ ভেবেছিলাম। ১ লাখ টাকা দিলেও ভাইকে ছাড়েনি। পুলিশকে জানানোর পর ২০ জুলাই ৯৮ হাজার টাকা ফেরত পেয়েছি।'

জানা গেছে, টঙ্গী পূর্ব থানার মধ্য আরিচপুরের মধুমতি রোডে দ্বিতীয়তলা ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন পল্টন। ১৪ জুলাই তাঁকে বাসা থেকে আটক করা হয়। পল্টনের স্ত্রী খুরশিদা আক্তার সোনিয়া বলেন, দুপুর ১টার দিকে সাদা পোশাকে ৮-১০ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে বাসায় ঢুকে তল্লাশি শুরু করেন। আসবাব তছনছ করা হয়। এক পর্যায়ে আলমারির ড্রয়ারে ছোট ব্যাগে রাখা দুই মাসের বকেয়া বাসা ভাড়ার ৩০ হাজার টাকা ও তিনটি মোবাইল ফোন আমার মেয়ের স্কুলব্যাগে ভরেন এবং পল্টন এলে তাকে ধরে নিয়ে চলে যান। পায়ে ধরলেও তাঁরা থামেননি।

তিনি বলেন, 'ঘণ্টাখানেক পর ফোন করে পল্টন বলে- ৩ লাখ টাকা দিলে স্যাররা ছেড়ে দেবেন বলেছেন। যেভাবে পার টাকা জোগাড় কর। আমি টাকা জোগাড়ে মরিয়া হয়ে উঠি। আবার ফোন দেয়। এত টাকা কোথায় পাব বললে ওখান থেকে একজন বলে, আপাতত ১ লাখ টাকা দিলেই হবে। সন্ধ্যায় আবার ফোন করে বিকাশ নম্বর দেয়। পরে ওই নম্বরে ১ লাখ টাকা পাঠাই। কিন্তু এরপর থেকে পল্টনের নম্বর বন্ধ পাই।'