রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক আছেন ১০ জন। প্রয়োজন না থাকলেও এই শিক্ষকদের সরকারই এখানে পদায়ন করেছে। অতিরিক্ত শিক্ষকদের মধ্যে ভৌতবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও ভুগোলে ৩ জন করে এবং কৃষি শিক্ষায় রয়েছেন একজন।

মিরপুরের রূপনগর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চিত্রও প্রায় একই। এখানে অতিরিক্ত শিক্ষক আছেন ৯ জন। তাঁদের মধ্যে সামাজিক বিজ্ঞানেরই ৬ জন। এ ছাড়া ইংরেজির দু'জন ও গণিতের একজন। এই চিত্র রাজধানীর প্রায় সব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। দলীয় ও প্রশাসনিক নানা তদবিরে ঢাকার স্কুলগুলোতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিক্ষক পদায়ন করে রেখেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। এই শিক্ষকদের অনেকেই প্রভাবশালীদের আত্মীয়স্বজন।

আবার ঢাকার বাইরের চিত্র ঠিক বিপরীত। বরগুনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকের মোট পদ ৪৯ জনের। আছেন মাত্র ২০ জন, ২৯ জনই নেই। বরগুনা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪৯ জনের মধ্যে আছেন ৩১ জন। পিরোজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪৯ জনের মধ্যে কর্মরত আছেন ৩২ জন। ভোলা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪৯ জন শিক্ষকের মধ্যে আছেন ২৯ জন।

তবে এসব বিদ্যালয়ের চেয়েও করুণ অবস্থা চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার কারগিল সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের। এ বিদ্যালয়ে ১৫টি শিক্ষক পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন। কক্সবাজারের মহেশখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০ জন শিক্ষকের মধ্যে এখন মাত্র ৪ জন পাঠদান করছেন। ফলে এ দুটি বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়াই দুরূহ হয়ে পড়েছে। রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলার ভুবন জয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৫টি শিক্ষক পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র সাতজন। একই জেলার রাজস্থলী উপজেলার তাইতংপাড়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯ জন শিক্ষকের মধ্যে এখন আছেন ৪ জন। রাজধানী ঢাকায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিক্ষক পদায়ন দিয়ে রাখলেও, মফস্বলের এসব বিদ্যালয় এখন শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদায়ন নিয়ে এমন হযবরল অবস্থা বিরাজ করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এই স্কুলগুলো পরিচালনা ও শিক্ষকদের বদলি ও পদায়ন করে থাকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাউশিরই একটি চক্র এই শিক্ষকদের বদলি নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা একই শিক্ষকদের বছরের পর বছর ঢাকায় থাকার ব্যবস্থা করছে। কখনও এই শিক্ষকদের ঢাকার বাইরে বদলির প্রক্রিয়া শুরু হলেও এই চক্র তা আটকে দেয়। এই চক্রকে ম্যানেজ করা ছাড়া বাইরের কোনো শিক্ষকের পক্ষে ঢাকায় বদলি হয়ে আসা বা ঢাকায় থাকা প্রায় অসম্ভব।

জানা গেছে, মাউশির একজন উপপরিচালক এই চক্রের প্রধান হোতা। তার সঙ্গে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির কয়েক তথাকথিত নেতাও রয়েছেন। সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী একজন শিক্ষক একই এলাকায় সর্বোচ্চ তিন বছর থাকতে পারেন। তবে সুবিধাভোগীদের কেউ কেউ রাজধানীতে আছেন ২৬-২৭ বছর পর্যন্ত।

ঢাকায় মোট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে ৩৮টি। সমকালের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এগুলোতে এই মুহূর্তে ২১৯ জন শিক্ষক অতিরিক্ত আছেন। শুধু সামাজিক বিজ্ঞানেই অতিরিক্ত আছেন ৯৯ জন। এসব বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক পদ ১ হাজার ৫৮০টি। এর মধ্যে সহকারী শিক্ষক ৭৯০ জন এবং সিনিয়র শিক্ষক ৭৯০ জন। তবে এখন বেশি আছেন ২১৯ জন। অতিরিক্ত শিক্ষকের মধ্যে ৮৭ শতাংশই সিনিয়র শিক্ষক। বাকিরা সহকারী শিক্ষক।

রাজধানীর দারুস সালাম সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বেশি আছেন ৭ জন, যাদের ৫ জনই সামাজিক বিজ্ঞানের। ধানমন্ডি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ফিডার শাখায় ১০ জন শিক্ষক অতিরিক্ত রয়েছেন, যাদের মধ্যে ইংরেজিরই ৪ জন। নবাবপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত ৪ জন শিক্ষকের তিনজনই সামাজিক বিজ্ঞানের। টিকাটুলি কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ জন অতিরিক্তের ৩ জন সামাজিক বিজ্ঞানের।

কোথায় কত অতিরিক্ত শিক্ষক: আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছেন ৭ জন। তাঁদের মধ্যে সামাজিক বিজ্ঞানেরই ৪ জন। এ ছাড়া ইংরেজি, জীবনবিজ্ঞান ও কৃষি শিক্ষার একজন করে অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছেন। আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বেশি আছেন তিনজন। উত্তরখান সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত আছেন ৫ জন। এই বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষকের কোনো পদ না থাকলেও একজনকে এ পদে রাখা হয়েছে। খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত আছেন আটজন, তাঁদের ৫ জনই সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক। বাকি তিনজন ব্যবসায় শিক্ষার।

গণভবন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বেশি আছেন ৬ জন, গভর্নমেন্ট সায়েন্স হাইস্কুলে অতিরিক্ত শিক্ষক ৩ জন, তাঁরা সবাই সামাজিক বিজ্ঞানের। শহীদ শেখ রাসেল উচ্চ বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত দু'জন, সরকারি জামিলা আইনুল আনন্দ বিদ্যালয় ও কলেজে ৩ জন, মিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ জন, শহীদ মনুমিঞা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫ জন, শেখ জামাল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩ জন এবং মোহাম্মদপুর কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৬ জন।

একইভাবে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪ জন, মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯ জন, ভাসানটেক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২ জন, শ্যামপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৮ জন, বাংলাবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২ জন, সরকারি কালাচাঁদপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে ২ জন, মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩ জন, টিকাটুলি কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ জন, ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ হাইস্কুলে ২ জন এবং তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫ জন অতিরিক্ত শিক্ষক কর্মরত আছেন।

এ ছাড়া নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪ জন, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একজন, ধানমন্ডি কামরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২ জন, ঢাকা গভর্নমেন্ট মুসলিম হাইস্কুলে ৭ জন, দারুস সালাম সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৭ জন, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে একজন, নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫ জন, জুরাইন শেখ কামাল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫ জন, নিউ গভর্নমেন্ট গার্লস হাইস্কুলে ৩ জন এবং ধানমন্ডি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০ জন শিক্ষক অতিরিক্ত রয়েছেন। এর বাইরেও বিভিন্ন স্কুলের ফিডার শাখায় বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছেন।

এসব বিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ পরিস্থিতির জন্য মূলত মাউশিই দায়ী। রূপনগর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামরুন নাহার চৌধুরী সমকালকে বলেন, পদায়ন করে মাউশি, আমরা বিদ্যালয় পরিচালনা করি। অতিরিক্ত শিক্ষকদেরও ক্লাস নিতে হয়। তবে বিষয়ভিত্তিক পদায়ন না হওয়ায় এক বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হয়।

তবে রাজধানীর সরকারি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে হাজী এ গফুর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সবুজবাগ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে কোনো অতিরিক্ত শিক্ষক নেই।

দুই দশক ধরে ঢাকায়: অনুসন্ধানকালে দেখা গেছে, সবুজবাগ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আব্দুস সালাম টানা ২২ বছর ধরে ঘুরেফিরে ঢাকার বিভিন্ন স্কুলে চাকরি করছেন।

গণভবন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের খালেদা ইয়াছমিন ১৯ বছর ও ফারজানা খন্দকার ২২ বছর, নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মোসাঃ ছাবিনা ইয়াছমিন ২২ বছর, ইসরাত জাহান ২৬ বছর, লুৎফুন নাহার ১৭ বছর, মো. নাজমুল আলম ১৪ বছর, শামছুন করিম ১৮ বছর, মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মো. মাসুদুর রহমান খান ২৬ বছর, আকলিমা আজিজ ২৪ বছর, মোসাম্মৎ হোসনে রেদোয়ান ১৫ বছর, নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মো. আমীর হোসেন ২৭ বছর, মো. লুৎফর রহমান ২৫ বছর, অর্চনা দাস ১৮ বছর ধরে ঢাকায় কর্মরত আছেন। এভাবে বিভিন্ন বিষয়ের পাঁচ শতাধিক শিক্ষক একই বিদ্যালয়ে, অথবা ঘুরেফিরে ঢাকার সরকারি স্কুলগুলোতে বছরের পর বছর পার করেছেন।

নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন নিয়েও সংশয়: আগামী জানুয়ারি থেকে মাধ্যমিক স্তরে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন কারিকুলামে শিক্ষকদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে চলছে শিক্ষক প্রশিক্ষণ। নতুন কারিকুলামে মাধ্যমিকে বেশিরভাগ বিষয়ে ৫০ শতাংশ নম্বরের জন্য পরীক্ষা ও বাকি ৫০ শতাংশের ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হবে ক্লাসে। অথচ রাজধানীর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক ধরন অনুসারে শিক্ষক পদায়ন করা নেই। এসব বিদ্যালয়ে এক বিষয়ের শিক্ষক আরেক বিষয়ের ক্লাস নিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এখানে নতুন কারিকুলাম কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সন্দিহান খোদ প্রধান শিক্ষকরাই।

মাউশির ভাষ্য: এ বিষয়ে মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক বেলাল হোসাইন সমকালকে বলেন, নানা কারণেই ঢাকায় বিদ্যালয়গুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক কম-বেশি হয়ে গেছে। তবে এটা সমন্বয় করা প্রয়োজন।

শিক্ষক পদায়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উপপরিচালক (মাধ্যমিক) আজিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে। তিনি এ বিষয়ে বলেন, 'পদায়ন আমি একা করি না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে পদায়ন হয়।' তিনি স্বীকার করে বলেন, নতুন কারিকুলামে প্রশিক্ষণবিহীন কোনো শিক্ষক আগামী ৩১ ডিসেম্বরের পর আর ক্লাস নিতে পারবেন না।

ঢাকায় নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন কীভাবে হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডিসেম্বরের আগেই তহ্নাঁরা ঢাকার স্কুলগুলোর শিক্ষকদের বিষয় সমন্বয় করে ফেলবেন। এ জন্য কাজ চলছে। বিদ্যমান শিক্ষকদের সফটওয়্যারের মাধ্যমে সমন্বয় করাতে প্রধান শিক্ষকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।