‘পঁচাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড দেশকে ধারাবাহিক বিপর্যয়ে ফেলে দিয়েছিল। আর সেই ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন প্রথম সামরিক স্বৈরশাসক ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান।’

শুক্রবার সেন্টার ফর রিসার্স অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি আদায়ে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা, ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রণয়ন এবং সেসময় জিয়াউর রহমানের নানা ‘ষড়যন্ত্রের’ কথা তুলে ধরেন গবেষকরা।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআরআই’র আলোচনা সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান, লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিক্সে সাউথ এশিয়ান ইতিহাসের গবেষক মালিহা আহমেদ এবং লেখক ও ইতিহাসবিদ সুদীপ চক্রবর্তী।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামস রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরই একটি সামরিক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ এবং কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৫ অগাস্টের খুনিদের পুনর্বাসন করা হয়। এরপর নাটকীয়ভাবে তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়ার আগমন ঘটে। কয়েক বছরের মধ্যে তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান হয়ে ওঠেন, তারপর রাষ্ট্রপতি, পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন এবং নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ সংঘটনকারী মুজিব হত্যাকারীদের ও যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করেন।

তিনি বলেন, পঁচাত্তরের পরে স্বাধীনতার চেতনা-ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রগতিশীল মতাদর্শকে ধ্বংস করে দেশকে উল্টোপথে ঠেলে দেওয়া হয়।

ওয়েবিনারে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধু যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন সেনাবাহিনীর ইউনিফর্মের একটি ঘটনা ঘটেছিল।

তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত ছিল, ভারত থেকে টেক্সটাইল সামগ্রী আমদানি করার। প্রতিরক্ষা সংস্থার প্রতিক্রিয়া ছিল যে, ভারতের টেক্সটাইল সামগ্রী নিম্নমানের এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইউনিফর্মও নিম্নমানের। ইউনিফর্মের জন্য টেক্সটাইল পাকিস্তানে অনেক উন্নত।

তিনি আরও বলেন, তখন সামরিক সংস্থাগুলো কী ধরনের পাকিস্তানি প্রত্যাশা বা আকাঙ্ক্ষা গ্রহণ করেছিল পোশাকের এই ঘটনা সেই ইঙ্গিত দেয়। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা এখনও আছে বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা মশিউর রহমান।

লেখক ও ইতিহাসবিদ সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, একজন তরুণ তারকা থেকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের নেতা হয়েছিলেন এবং কাউন্টির দৃষ্টিভঙ্গিকে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতায় পরিণত করেছিলেন।

তিনি বলেন, এখন বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে ভালো ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা করছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিও খুবই প্রশংসনীয়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস খাত রয়েছে বাংলাদেশের।

‘১৯৭৫ বাংলাদেশ এবং বিশ্ব: একটি বিশাল সংস্কার এবং একটি হত্যাকাণ্ড’ শীর্ষক আলোচনায় মালিহা আহমেদ বলেন, বড় বড় দেশগুলোর কাছ থেকে কূটনৈতিক উপায়ে বাংলাদেশের স্বীকৃতি এনেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং সেই মর্যাদা অর্জনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন।

তিনি বলেন, বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ। সেসময় ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার মতো বড় দেশগুলো তাদের স্বীকৃতি ধরে রেখেছিল।

মালিহা বলেন, পাকিস্তান ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। এগুলো সবই বাংলাদেশের জাতিসংঘে প্রবেশের জন্য একটি বড় বাধা ছিল। সুতরাং, বঙ্গবন্ধু এটি নিয়ে কাজ করছিলেন এবং তিনি একটি সার্বভৌম দেশ হিসাবে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বীকৃতি অর্জনের জন্য দেশগুলোর মধ্যে অনেক বৈঠক করেছিলেন।

পাকিস্তান তাদের যুদ্ধবন্দীদের বিনিময়ে স্বীকৃতি দিতে রাজি হয়েছে। পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার পর চীন ভিটো প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। পাকিস্তানের স্বীকৃতি অন্যান্য দেশ থেকেও স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য একটি ডমিনো প্রভাব তৈরি করে।