সাবরিনা (ছদ্মনাম) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক জনপ্রিয় গায়কের ভুয়া (ফেক) আইডি থেকে তাঁর সঙ্গে এক প্রতারক যোগাযোগ শুরু করে। বিভিন্নভাবে নিজের ফেক আইডিকে ভেরিফাইড অ্যাকাউন্ট করেছিল সেই প্রতারক। শুরুতে সন্দেহের কারণ ছিল না। সাবরিনাও বিনা দ্বিধায় কথা চালিয়ে যান। কথা বলার কিছুদিনের মধ্যেই সাবরিনা বুঝতে পারেন লোকটির কথা কেবলই যৌনতাকেন্দ্রিক- এমন সব অশালীন কথা যেগুলো সাবরিনার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। সন্দেহ বাড়তে থাকলে এক পর্যায় ট্রু কলারের মাধ্যমে সাবরিনা জানতে পারেন, এই প্রতারক তার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েরই দর্শন বিভাগের একজন সিনিয়র সহশিক্ষার্থী।

সাবরিনা গভীরভাবে আশাহত হন। নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নিজেকে অনিরাপদ অনুভব করতে থাকেন। ভয় আর শঙ্কা নিয়ে কাটছে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো। সাবরিনা এ ঘটনাটি কাউকে বলতে পারেননি। কারণ সবাই হয়তো তাঁকেই দোষারোপ করবে, হয়তো তাঁকেই শুনতে হবে যে সে ভুল পথে এগিয়েছে বা তাঁর আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল। অন্যদিকে অপরাধী দেদার নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও প্রতারণা করেই যাচ্ছে।

আইসিটি বিভাগের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব আইসিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (বিআইআইডি) জরিপ থেকে দেখা যায়, দেশে ৮০ শতাংশ সাইবার ক্রাইমের ভুক্তভোগীর মধ্যে ৬৪ শতাংশ শহরাঞ্চলের কিশোরী এবং বাকি ৩৩ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের কিশোরী যৌনতাপূর্ণ ভিডিও, বার্তা এবং ছবির মাধ্যমে সাইবার ক্রাইমের শিকার হচ্ছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৪৯ শতাংশ স্কুল শিক্ষার্থী সাইবার বুলিংয়ের শিকার এবং হতাশার জায়গা এটাই, মাত্র ২৬ শতাংশ ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে।

সাইবার অপরাধ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়। সমাজে পুরুষতান্ত্রিক বৈষম্যের কারণে নারীর প্রযুক্তিজ্ঞান বিকাশের সুযোগ-সুবিধাও কম। ফলে সাইবার অনিরাপত্তারও শিকার নারী। বাংলাদেশে এখনও সাইবার পুলিশ পুরো সাইবার জগতের বিশালতাকে নিজেদের আওতায় আনতে পারেনি, আইডি হ্যাক বা ব্যক্তিগত তথ্য ভাইরাল হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা উচ্চমহলের কোনো নারীর সঙ্গে ঘটলেই শুধু তা আলোচিত হয় এবং তদন্তের আশ্বাস পাওয়া যায়। কিন্তু মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীদের ক্ষেত্রে তা নিতান্তই নগণ্য।

সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো, এটি নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় অন্তরায়। বাংলাদেশ উইমেন ল' অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে ২০১৩ সালে ২৩ জন আত্মহত্যা করেছেন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন হাজারো নারী।

নারী যেন বিনা দ্বিধায় নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপরাধ নিয়ে কথা বলতে পারেন ও আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা। কেবল বাস্তবজীবনে নয়, এর প্রতিফলন ঘটতে হবে সাইবার জগতেও। তবেই নারীর সাইবার জগৎ হবে মানবিক ও নিরাপদ।