দ্রব্যমূল্যের অব্যাহত ঊর্ধ্বগতি ও বিদ্যমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের সদস্যরা বলেছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী সংকটের কারণেই দেশের বাজারে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যরা এ সংকটের জন্য সরকারের ভুল নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতাকে দায়ী করেছেন। তাদের দাবি, সরকারের কোথাও কোনো জবাবদিহীতা নেই।

তবে, আওয়ামী লীগ শরিক দলের এমপিরা সমালোচনার ক্ষেত্রে অনকটা সতর্ক থেকেছেন। সংকট থেকে বের হয়ে আসতে সরকারকে দিয়েছেন কিছু পরামর্শও। 

মঙ্গলবার সংসদের বৈঠকে ১৪৭ বিধির আওতায় আনা প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সদস্যরা এসব কথা বলেন। এর আগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। 

‘সংসদের অভিমত এই যে, কোভিড-১৯, বৈশ্বিক অস্থিরতা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রভৃতি সমস্যা মোকাবিলা করার নিমিত্ত সরকারের গৃহীত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী টেকসই পদক্ষেপসমূহ মহান সংসদে আলোচনার মাধ্যমে জাতিকে অবহিত করা হোক’—এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ও দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক। 

প্রস্তাব উত্থাপনের সময় তিনি বলেন, সরকার জ্বালানি কূটনীতিতে মনোযোগী নয়। ওপেকভুক্ত বড় তেল উৎপাদনকারী কোম্পানি এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের স্থায়ী কোনো চুক্তির উদ্যোগ নেই। প্রাথমিক জ্বালানি, পরিকল্পনা জ্বালানি, নিরাপত্তা সরবারাহ নিশ্চিতের ধারণাই ছিল না সরকারের বরং ছিল স্পট মার্কেট থেকে আমদানি প্রীতি। কারণ এর মধ্যে অন্তর্নিহিত কোনো স্বার্থ আছে। প্রাথমিক জ্বালানির উৎস এবং সরবরাহ নিশ্চিত না করেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এক লাফে ৪১ থেকে ৫১ শতাংশ ডিজেল, অকটেন এবং পেট্রলের মূল্য বাড়ানো হয়েছে। স্বাধীনতার পরে একক কোনো পণ্যের দাম এত বৃদ্ধি করা হয়নি। এ কারণে সব জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। তেলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই এমন সব পণ্যের মূল্যও কালোবাজারি, অসৎ ব্যবসায়ীরা বাড়িয়ে দিয়েছেন। সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এতে।

জাপা মহাসচিব বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষ আসলেই খুব খারাপ অবস্থায়। পণ্যের দাম যে আরও বাড়বে না, তার কোনো ঠিক নেই।

বিভিন্ন ব্যাংকে বিপিসির ২৫ হাজার ২৬৪ কোটি জমা আছে উল্লেখ করে মুজিবুল হক বলেন, ওই ব্যাংকগুলোর অবস্থা কাহিল। ঋণ দিয়ে তাদের এখন মূলধন নেই। বিপিসি চাইলেও টাকা ক্যাশ করতে পারবে না।

বিপিসি কার স্বার্থে এই টাকা ওই সব ব্যাংকে রেখেছে সে প্রশ্ন রাখেন তিনি। 

চুন্নু আরও বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে প্রচুর আয় করেছে বিনিয়োগকারীরা। ১২ বছরের এখানে খরচ হয়েছে ৮৬ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। এমনকি ভারতে থেকে গত ৯ বছরে বিদ্যুৎ আমদানিতে ক্যাপাসিটি চার্জ গেছে ১১ হাজার ১৫ কোটি টাকা। ভর্তুকির পুরোটাই অপ্রয়োজনীয়, অলস, রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি এবং ওভারহেডিং চার্জে গেছে। গত ছয় বছরে ৬২ হাজার কোটি টাকা বেসরকারি বিদ্যুত কেন্দ্রের ভাড়া দিচ্ছে সরকার। এসব কেন্দ্রের পূর্ণ সক্ষমতা দূরে থাক, ৩০ শতাংশ উৎপাদন সম্ভব হয়নি। অলস, বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখে অর্থ দিয়েছে কী কারণে? সরকারের এত বড় ভুল নীতি কি কারণে?

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারি বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই মূল্যস্ফীতি আছে। কোনো কোনো দেশে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। সমস্যা হচ্ছে আমাদের ক্রয় ক্ষমতা বাড়েনি। সরকারের কাছে বিপুল অর্থ থাকার কথা। সেটি নেই। সরকার অনেক ভালো প্রকল্প নিয়েছে। কিন্তু সরকার অনেক ভুল করেছে। এখন সময় ভুল স্বীকার করার। যাতে ভবিষ্যতে এই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে বিপুল অর্থ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, রামপাল প্রকল্পে সঞ্চালন লাইন নেই কিন্তু ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, পায়রা বন্দর জানা কথা এখানে পলি পড়বে কিন্তু সেখানে হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। বুলেট-পাতাল রেলের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ৫০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে, ভ্যাট অটোমেশন প্রকল্পে ৬০০ কোটি টাকা লোন নেওয়া হয়েছে কিন্তু সেটি কার্যকর হয়নি। আমরা স্যাটেলাইট করেছি। সেখান থেকে কত টাকা আসবে?  

‘উন্নয়নের অতিউৎসাহ, অতি আনন্দে কিছুটা উদ্ভাসিত হয়ে গিয়েছিলাম। সরকার পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু ঋণ পরিবর্তন হবে না। কোনো সরকার এতগুলো সমস্যা একসঙ্গে সমাধান করতে পারবে না। এই সমস্যা এখন আর শুধু আওয়ামী লীগ বা সরকারের নেই। এটি এখন জাতীয় সমস্যা। জাতীয়ভাবেই এটি সমাধান করতে হবে। সরকারকে সে পথেই এগোতে হবে। উন্নয়নের অতিউৎসাহ নিস্প্রয়োজন, উন্নয়নের অহমিকা বিপজ্জনক, উন্নয়নের অতিরঞ্জিত প্রপাগান্ডা মেশিনারিজ ভয়ঙ্কর’, যোগ করেন তিনি।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ক্ষমা চান ইনু 

দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইলেন আওয়ামী লীগের জোট শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু। নিজের ও সরকারের পক্ষে ক্ষমা চেয়ে তিনি বলেন, মানুষ কষ্টে আছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সংকটের জন্য এই কষ্ট হঠাৎ শুরু হয়েছে। 

সরকারের মন্ত্রীদের অতিকথনের সমালোচনা করে হাসানুল হক ইনু বলেন, প্রধানমন্ত্রী সমবেদনা প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য মানুষের দুঃখ কষ্ট নিয়ে সমবেদনার বদলে ঠাট্টা-মশকরা করছেন। এটি মর্মান্তিক ও দুর্ভাগ্যজনক। দায়িত্ব পালন যারা করতে পারবেন না, তারা দায়িত্ব ছেড়ে দেন। মানুষকে বাঁচান, প্রধানমন্ত্রীকেও বাঁচান।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, এই সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে।  তবে বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি মোকাবিলা করা যাচ্ছে না। পরিবহনের বিশৃঙ্খলা মোকাবিলা করা যাচ্ছে না। ডলার সংকটের অব্যবস্থাপনা মোকাবিলা করা যাচ্ছে না। প্রশাসনে সমন্বয়হীনতা দেখা দিচ্ছে। উল্টোপাল্টা কথাবার্তা দেখা দিচ্ছে। এজন্যই অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি হচ্ছে। বাজার অস্থির করে তুলছে। আড়তদার, উৎপাদক, খুচরা বিক্রেতা একেকজন একেক কথা বলে দোষারোপ করছে। ডিমের ক্ষেত্রে তো দেখলাম ভোক্তা অধিকারের হস্তক্ষেপে দাম নেমে এলো। তাহলে চালের বাজার কেন নামবে না? 

ইনু সংকট মোকাবিলায় এক গুচ্ছ প্যাকেজ প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, এই প্রস্তাব অসাধু কারসাজিদের সিন্ডিকেট ধ্বংস করে দেবে। 

সিঙ্গাপুরের দিকে রওয়ানা দিয়ে শ্রীলঙ্কার পথে: রুমিন 

বিএনপির সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, যাত্রা শুরু হয়েছিল সিঙ্গাপুরের দিকে। কেন জানি না শ্রীলঙ্কার দিকে যাত্রা শুরু করলাম। এই সরকারের উন্নয়নের বয়ানের মধ্যে ছিল অবকাঠামো, প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয়। কিন্তু এখন রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, রাজস্ব আয়, ডলারের বিপরীতে টাকার মানের মত সামষ্ঠিক অর্থনীতির সব সূচক নিম্নমুখী। সরকারের আচরণ বলছে, দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছে ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাওয়া, বিলাসী পণ্য আমদানি নিরুৎসাহীত করা, নানাভাবে সরকারের ব্যয় সংকোচনের মতো পদক্ষেপ তীব্র সংকটকে নির্দেশ করে।

বিবিসির প্রতিবেদন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সংকট কি ভুল নীতির কারণে? নাকি ভয়ঙ্কর লুটপাটের অনিবার্য পরিণতি। জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো দল যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তাদের কিছু ‘অলিগার্ক’ তৈরি করে থাকতে হয়। নীতি প্রণয়ন করতে হয় তাদের স্বার্থে। বাংলাদেশেও তাই হয়েছে। ব্যাংকগুলো খালি করে ফেলা হয়েছে কিছু অলিগার্কের স্বার্থে। বিদ্যুৎ খাতে পরিষ্কার হচ্ছে বেশি দামে ইনডেমনিটির মাধ্যমে বিপুল টাকা খরচ করে গত কয়েক বছরে কিছু কোম্পানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ৯০ হাজার কোটি টাকার বেশি। সরকার বলছে, চাহিদার দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা সরকারের কাছে। তাহলে কেন ইনডেমনিটি দিয়ে এই কুইক রেন্টাল চালু রাখা হচ্ছে?

রুমিন ফারহানা বলেন, দ্রব্যমূল্য বাড়লে সমস্যায় পড়ে মধ্যবিত্ত। না পারে চাইতে না পারে সইতে। বহু মানুষ আত্মহত্যা করছে। চাহিদা পূরণ করতে না পেরে। বহু মানুষ চুরি ছিনতাইয়ের পথ বেছে নিচ্ছে। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। এর মাধ্যমে সরকার এক ঢিলে তিন পাখি মারতে চায়। প্রথমত, আইএমএফের শর্ত পূরণ, দ্বিতীয় বড় অংকের রাজস্ব আদায়। আর তিন নম্বর অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমার কারণে আমদানি কমবে ফলে কিছু রিজার্ভ বাঁচাতে পারবে।

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এই সমস্যা সাময়িক: সরকারি দল 

আওয়ামী লীগের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিএনপি দলীয় সদস্যদের কথার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। ইউরোপে এখন ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি। জার্মানির মতো দেশে হাহাকার চলছে। কোনো কোনো দেশে মুদ্রাস্ফীতি ২৩ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে। সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা অনেক মজবুত।

ফারুক খান বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। বহু দেশে মুদ্রাস্ফীতি সর্বোচ্চ। জামানিতে ৫০ বছরে সর্বোচ্চ। যুক্তরাজ্যে ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। করোনার লকডাউনে স্থবির ছিল অর্থনীতি।

ওয়াসিকা আয়েশা খান বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের সব দেশে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের বাইরে নয়। বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। সরকার চেষ্টা করছে সমাধানের। যেভাবে কোভিড মোকাবিলা করা হয়েছে। 

আহসানুল হক টিটো বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় দেশে মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক কম। রিজার্ভে চাপ পড়েছে। কিন্তু প্রতিবেশীদের তুলনায় অনেক কম। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ক্রাইসিসে। সেখানে বাংলাদেশ দূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে ভালো অবস্থানে।