লেখাপড়া বলতে কেবলই অষ্টম শ্রেণি পাস। আর এতটুকু লেখাপড়া করেই এখন রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) রীতিমতো ইন্সপেক্টর তিনি! এক প্রকার অসাধ্যকে সাধন করেছেন আরএনবির ইন্সপেক্টর মো. ইসরাইল মৃধা। সিপাহি থেকে নায়েক, নায়েক থেকে হাবিলদার, হাবিলদার থেকে এএসআই, এএসআই থেকে এসআই কিংবা এসআই থেকে ইন্সপেক্টর- প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার পরও অবিশ্বাস্যভাবে বাহিনীর পাঁচ ধাপ পার হয়ে গেছেন তিনি। এমনকি পাঁচ বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের মতো শাস্তি চলাকালেই সর্বশেষ তিনি পেয়ে গেছেন ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি।

বর্তমানে রেলওয়ের চট্টগ্রামস্থ পাহাড়তলী স্টোরস চৌকিতে ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত ইসরাইল মৃধা। আসামি ছেড়ে দেওয়া, নির্যাতন করে বাহিনীরই এক হাবিলদারের বিরুদ্ধে জবানবন্দি আদায়, দায়িত্ব পালনে গাফিলতিসহ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজন থাকার পাশাপাশি বাহিনীর চিফ কমান্ড্যান্টের আশীর্বাদে পার পেয়ে যাচ্ছেন তিনি, পাচ্ছেন একের পর এক পদোন্নতিও।
১৯৮৫ সালের রিক্রুটমেন্ট রুলস অনুযায়ী, অষ্টম শ্রেণি কিংবা এসএসসি পাস করা বাহিনীর একজন সিপাহি সর্বোচ্চ হাবিলদার এবং এইচএসসি পাস হলে এএসআই হতে পারেন। এসআই কিংবা ইন্সপেক্টর পদের জন্য স্নাতক পাস বাধ্যতামূলক। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার পরও দফায় দফায় পদোন্নতি পেয়েছেন ইসরাইল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইসরাইল মৃধার চাচাতো ভাই ছিলেন আরএনবির চিফ কমান্ড্যান্ট ইকবাল হোসেন। ইকবালের ভগ্নিপতি ছিলেন আরএনবির সাবেক চিফ কমান্ড্যান্ট শাহ আলম ভূঁইয়া। এ হিসেবে ইসরাইল মৃধার চাচাতো ভগ্নিপতি হন তিনি। আরএনবিতে এমন আত্মীয়স্বজন কাজ করে যাওয়ার কারণে নিয়োগ পেতে যেমন সমস্যা হয়নি ইসরাইল মৃধার, তেমনি সমস্যা হয়নি নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতিতেও। আবার গুরু অপরাধ করেও ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন লঘুদণ্ডে।

গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর রেলওয়ের পাহাড়তলী লোকোশেডে চুরির সময় লোকোশেডের কর্মচারীরা তিন চোরকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। কিন্তু সে সময় ইন্সপেক্টর পদে চলতি দায়িত্বে থাকা ইসরাইল মৃধা মূল আসামিকে ছেড়ে দেন এবং তাকে বাদ দিয়ে মামলা করেন। এ ঘটনায় গত ১৯ জানুয়ারি আরএনবির চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমান্ড্যান্ট শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে শাস্তি হিসেবে তাঁর পাঁচ বছর বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করেন।
গত ১৯ ও ২০ মার্চ চট্টগ্রামের পাহাড়তলী স্টোরসের রেলের মালপত্র চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মামলা হলে গ্রেপ্তার করা হয় আকরাম আলী নামে এক আসামিকে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আকরাম চুরির ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বীকার করার পরও ইসরাইল মৃধা তাকে অমানুষিক নির্যাতন করেন। আর সেই চুরির ঘটনায় হাবিলদার কৃষ্ণপদ চক্রবর্তী নামে আরএনবির এক হাবিলদারের সম্পৃক্ততা থাকার জবানবন্দি আদায় করেন। এ ঘটনায় গত ১০ এপ্রিল তাঁকে চট্টগ্রাম দপ্তরে ক্লোজ করা হয়। এ ছাড়া গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর আরএনবির জেনারেল স্টোর ডিপোর গেট সার্জেন্ট অফিসের জিডিতে জায়গা ফাঁকা রাখেন তিনি। যাতে সেই ফাঁকা জায়গায় ইচ্ছামতো ডায়েরি লিপিবদ্ধ করা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে বিষয়টি অত্যন্ত গর্হিত কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিষয়টি ধরা পড়ায় গত বছরের ৪ মার্চে তাঁকে তিরস্কার করে চিঠি দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরও নানা অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

১৯৮৬ সালে সিপাহি (প্রহরী) পদে আরএনবিতে যোগদান করেন ইসরাইল মৃধা। সর্বশেষ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আওতাধীন আরএনবির বিভিন্ন চৌকিতে ইন্সপেক্টর পদে চলতি দায়িত্ব পালন করা সাতজন এসআইকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি আরএনবির অ্যাসিস্ট্যান্ট কমাড্যান্ট (সদর) মো. মুজিবুল হক স্বাক্ষরিত একটি দপ্তর আদেশের সেই তালিকায় তিন নম্বরে রয়েছে ইসরাইল মৃধার নাম। পদোন্নতি পাওয়ার পরদিনই পাহাড়তলী স্টোরস চৌকিতেই নিয়মিত ইন্সপেক্টর পদে দায়িত্বভার নেন তিনি। ২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রের 'খ' নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়, 'সংশ্নিষ্ট পদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতার চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো কর্মচারীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব কিংবা চলতি দায়িত্ব দেওয়া যাবে না।' ইসরাইল মৃধাকে ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই বিধিনিষেধ উপেক্ষা করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন বাহিনীর তৎকালীন চট্টগ্রামের কমান্ড্যান্ট শফিকুল ইসলাম। বেশ কিছু আরএনবি সদস্যের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন এই কমান্ড্যান্ট। তবে ইসরাইল মৃধার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পর রোষানলে পড়ে যান তিনি। ইসরাইল মৃধার শাস্তি চলাকালে পদোন্নতি দেওয়ার পর পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদের বেতন স্কেলে পে-ফিক্সেশন ফাইলে স্বাক্ষরে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। এসব ঘটনার মধ্যেই রেলের পশ্চিমাঞ্চলের লালমনিরহাটে কমান্ড্যান্ট হিসেবে বদলি করে দেওয়া হয় তাঁকে।

বিষয়ের সত্যতা নিশ্চিত করে কমান্ড্যান্ট শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী, ইসরাইল মৃধা পদোন্নতি পেতে পারেন না। যে পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, সেই পদে যে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকার কথা তা তার নেই। আবার অপরাধের শাস্তি চলাকালেও তার পদোন্নতি পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে তিনি পদোন্নতি পেয়েছেন। আমি জেনেশুনে তার পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদের বেতন স্কেলে পে-ফিক্সেশন ফাইলে স্বাক্ষর করিনি। বিষয়টি নিয়ে মতামত চাইতে ফাইলটি রেলের অর্থ বিভাগে পাঠিয়েছিলাম। নিজের অবস্থান থেকে বাহিনীর যে কোনো দুর্নীতি ব্যাপারে আমি জিরো টলারেন্স নীতিতে ছিলাম। এরই মাঝে আমাকে বদলি করে দেওয়া হলো।'

একই প্রসঙ্গে আরএনবির চট্টগ্রাম বিভাগের বর্তমান কমান্ড্যান্ট রেজোয়ান-উর সমকালকে বলেন, 'আরএনবির ইন্সপেক্টর পদের জন্য নূ্যনতম স্নাতক ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক। ইন্সপেক্টর হওয়ার ক্ষেত্রে ইসরাইল মৃধারও তাই থাকার কথা। কিন্তু তিনি যখন ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পান, তখন আমি বর্তমানে দায়িত্বে ছিলাম না। তবে তার শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।'
১৯৮৬ সালে ইসরাইল আরএনবির সিপাহি পদে যে আবেদন করেন তাঁর একটি কপি পেয়েছে সমকাল। অষ্টম শ্রেণি পাস হলেও আবেদনপত্রটি টানা হরফের ইংরেজিতে লেখা। একটি সূত্র জানিয়েছে, যে আবেদনপত্রের মাধ্যমে চাকরি হয়েছে, সেটিও তাঁর লেখা নয়। চিফ কমান্ড্যান্টের দায়িত্ব পালন করা তাঁর এক আত্মীয় নিজেই আবেদনপত্রটি লিখে দিয়ে তাঁর চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

যা বললেন ইসরাইল মৃধা :অভিযুক্ত ইসরাইল মৃধার মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টার পরও তাঁকে না পাওয়ায় তাঁর অধীনস্থ হাবিলদার শাহ আলম সোহাগের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে সমকালের কথা হয়। এ সময় এক কথায় অষ্টম শ্রেণি পাস করে আরএনবির সিপাহি পদে যোগ দিয়ে ইন্সপেক্টর পদ পর্যন্ত পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টি সমকালের কাছে স্বীকার করেন তিনি।

ইসরাইল মৃধা বলেন, 'সন্তোষজনক যোগ্যতার ভিত্তিতে আমাকে পদোন্নতিগুলো দেওয়া হয়েছে। বাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় পদোন্নতি পাওয়ায় আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।' বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি ও শাস্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'সাবেক কমান্ড্যান্ট শফিকুল ইসলামের রোষানলে পড়েছিলাম আমি। কোনো কারণে আক্রোশের বশবর্তী হয়ে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় মিথ্যা অভিযোগ এনে শাস্তি দিয়েছেন।

বিষয় : পাঁচ ধাপ পদোন্নতি অষ্টম শ্রেণি পাস মৃধার রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনী আরএনবি

মন্তব্য করুন