'কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড থেকে বলছি...। ২০২০ সালে আপনি সাধারণ চিকিৎসা অনুদানের জন্য আবেদন করেছিলেন। অনুদানের ৪০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন? আপনার নামে এখন আরও ২২ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে। টাকাটা জরুরি ভিত্তিতে নিতে হবে। কিছু জটিলতার কারণে ব্যাংক হিসাবে দেওয়া যাচ্ছে না। আপনার ভিসা কিংবা মাস্টারকার্ড থাকলে নম্বরটি দিয়ে সহায়তা করবেন।'

সরল বিশ্বাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (সম্প্রতি বদলি) ডা. নাসরিন সুলতানা ভিসাকার্ডের নম্বরটি দেওয়ার পর তাঁর কার্ড থেকে ২৯ হাজার ৮৮৮ টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্র। মোবাইল ফোনে বার্তা আসার পর তিনি বুঝতে পারেন, ফোনের অন্যপ্রান্ত থেকে যে ব্যক্তি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করেছিলেন, তিনি প্রতারক। এ ঘটনা গত ১ জুলাইয়ের।

প্রতারিত ডা. নাসরিন গত ৩ জুলাই রাজধানীর আদাবর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ডা. নাসরিনের মতো অসংখ্য সরকারি চাকরিজীবীর কাছে বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিচয়ে ফোন করে অনুদান দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্রটি। বিষয়টি জানার পর কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড কর্তৃপক্ষ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারসহ সংশ্নিষ্ট দপ্তরে লিখিতভাবে জানিয়েছে। এ পর্যন্ত অন্তত ৭৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এভাবে প্রতারিত হয়েছেন। আদাবর, খিলগাঁও, রমনাসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় একাধিক ভুক্তভোগী জিডি করেছেন। এসব জিডির সূত্র ধরে তদন্তে নেমেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন দল।

প্রতারিত ডা. নাসরিন সুলতানা বলেন, 'প্রথমে আমি বুঝতেই পারিনি, প্রতারিত হতে যাচ্ছি। যখন ভিসাকার্ডের নম্বর চাইল, তখন জানায়, টাকা তো ব্যাংক হিসাবে আসে। এরপর হিসাবে কিছু ঝামেলা আছে জানিয়ে কার্ড নম্বর নেয়। প্রথমে ওটিপি নম্বর দেওয়ার পর মেসেজ আসে, আমার কার্ড থেকে ২৯ হাজার ৮৮৮ টাকা ট্রান্সফার হয়ে গেছে। এরপর ফোন করে যখন আবার ওটিপি নম্বর চাইল, তখন টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ফোন কেটে দেয়। দ্বিতীয় ওটিপি নম্বর দিলে হয়তো বাকি টাকাটাও নিয়ে যেত প্রতারক চক্র।'

জানা যায়, বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা, শিক্ষাবৃত্তি, যৌথ বীমা ও লাশ দাফনের জন্য আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইএফটির (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) মাধ্যমে ব্যাংক হিসাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুদান দিয়ে থাকে কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড। সেবাগ্রহীতাদের ঠিকানা, অনুদানের কত টাকা কত তারিখে পেয়েছেন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন নম্বরসহ তাঁদের নামের তালিকা কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের ওয়েবসাইটে আপলোড করা থাকে। প্রথমে প্রতারক চক্র ওই তালিকা ধরে অনুদান পাওয়া ব্যক্তির সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে নেয়। তাতে থাকা মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে অনুদানের আগের সব তথ্য জানায়। এ কারণে অন্যপ্রান্তে থাকা ব্যক্তিকে কোনোভাবেই সন্দেহ করতে পারেন না ভুক্তভোগী। প্রতারক চক্রের সদস্যরা কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিচয় দিয়ে টার্গেট ব্যক্তির ভিসা কিংবা মাস্টারকার্ডের নম্বর ও মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ চেয়ে নেন। এরপর টার্গেট ব্যক্তিকে বলেন, 'আপনার ফোনের মেসেঞ্জারে একটি ওটিপি যাবে, সেটি দ্রুত দেবেন।' তাঁর কথামতো ওটিপি নম্বর দিয়ে দেন ভুক্তভোগী। এর পরই কার্ডে থাকা টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরিয়ে নেয় প্রতারক চক্র।

ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেন, অনুদান দেওয়ার নামে কৌশলে প্রতারক চক্র ক্রেডিট, ভিসা কিংবা মাস্টারকার্ড থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে- এমন একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতারক চক্রের কয়েকজন সদস্যকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে শুরু হয়েছে অভিযান। তিনি আরও বলেন, প্রতারক চক্রের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনও গ্রাহকের ওটিপি নম্বর চাইবে না। ওটিপি নম্বর চাওয়া মানেই বুঝে নিতে হবে, প্রতারক চক্র ফাঁদ পাতছে।

এদিকে, কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের সহকারী পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান গত ৫ জুন রমনা থানায় একটি জিডি করেন। তাতে বলা হয়, সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, প্রতারক চক্র মোবাইল ফোন ব্যবহার করে কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের পরিচয় দিয়ে সেবাগ্রহীতাদের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ কার্যালয় থেকে সব ধরনের অনুদান শুধু ইএফটির মাধ্যমে সেবাগ্রহীতার ব্যাংক হিসাবে দেওয়া হয়। কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড কখনও কারও বিকাশ, নগদ, রকেটের অ্যাকাউন্টের পিন নম্বর বা ওটিপি জানতে চায় না। অনুদানের টাকা পাওয়ার জন্য প্রলোভনে পড়ে কেউ লেনদেন করলে কল্যাণ বোর্ড দায়ী থাকবে না।

সহকারী পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, গত জানুয়ারিতে প্রতারণার বিষয়টি আমরা জানতে পারি। এরপরই ওয়েবসাইট থেকে অনুদানের তালিকা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এ তালিকা প্রতারক চক্র ডাউনলোড করে রেখে প্রতিনিয়ত তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের ফোন করে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করার চেষ্টা করছে।