তিস্তা চুক্তিতে গোড়ায় গলদ! সব জেনেবুঝেও চুপচাপ নয়াদিল্লি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিকে শিখন্ডি বানিয়ে তিস্তা চুক্তি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি। বিশেষজ্ঞরা বলছে, দুই দেশের আলোচনার টেবিলে বারবার এই এক জায়গাতেই পথ হারাচ্ছে তিস্তা চুক্তি। তিস্তা চুক্তি করতে হলে শুধু বাংলাদেশ সরকার, ভারত সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মধ্যে সম্মতি হলেই হবে না, আলোচনা টেবিল আসতে হবে ভারতের সিকিম রাজ্য সরকারকেও।

শুরু থেকে তিস্তায় পানি না থাকার দাবি জানিয়ে পানি চুক্তিতে আপত্তি জানিয়ে আসছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার দাবি সেচ প্রকল্প থেকে পানীয় জল প্রকল্প তিস্তার পানির ওপর নির্ভর করে তার রাজ্যের উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের জীবন। এমন অবস্থায় শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি না থাকার মমতার অভিযোগ অনেকাংশেই স্বীকার করে নিয়েছেন ভারত-বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের সদস্যরা।

তাহলে বারবার প্রশ্ন উঠছে তাহলে তিস্তার পানি যাচ্ছে কোথায়? আর এখানেই আলোচনার টেবিলে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে সিকিম রাজ্য সরকারের উপস্থিতি, প্রতি বৈঠকেই যে বিষয়টি বারবার উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। তিস্তার ওপর নির্মিত ৪২টি বাঁধের ৩৬টিই যেখানে সিকিমে অবস্থিত সেখানে বিজেপি জোটশাসিত সিকিম সরকারের আলোচনা টেবিলে না থাকা কার্যত বিস্ময়ের! আর এখানে প্রশ্ন উঠছে ভারতের বর্তমান বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে আদৌ কতটা সহানুভূতিশীল! তিস্তার ঠিক কত পরিমাণ পানি প্রত্যাহার করছে সিকিম তা আলোচনা টেবিলে আসা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারত-বাংলাদেশ যৌথ সহযোগিতা পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে ভারতের রাজনীতিবিদরা প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও বর্তমানে তিস্তার পানির ইস্যু এখন ভারতের দুই রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ভোট ব্যাংকের ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস বা বিজেপি কেউই ছাড় দিতে রাজি নয়। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গে কোটি মানুষের স্বার্থ উপেক্ষিত করে তিস্তার পানি চুক্তি হলে উত্তরবঙ্গের সাত লোকসভা আসন এবং প্রায় ৪০টি বিধানসভা আসন, প্রায় ৬০০ পঞ্চায়েত, ২০টির বেশি পৌর এলাকাতে সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোটে প্রভাব পড়বে।

ফলে তিস্তা চুক্তিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তি শুরু থেকেই অনেকটাই জোরালো। তবে ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোণঠাসা করে উত্তরবঙ্গের ৭ জেলায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে বিজেপি। ফলে একা শুধু মমতার ভোটব্যাংক নয় কোটি মানুষের স্বার্থ উপেক্ষিত হলে ভোটে বাক্সে প্রভাব পড়বে বিজেপিরও।

অন্যদিকে তিস্তার পানির ওপর নির্মিত একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প অর্থনীতির চাকা সচল রাখে সিকিম রাজ্য সরকারের। যেখানে   এসএনএফ-বিজেপি জোটশাসিত রাজ্য সরকার সিকিমের সাধারণ মানুষের (ভোটারদের) স্বার্থ উপেক্ষিত কতটা করবে সেটা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

বারবার বিষয়টি নিয়ে ইঙ্গিত দিলেও রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি কখনোই সিকিমের নাম সামনে আনেননি মমতা। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের আগে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে হুগলি জেলার হিন্দমোটরে রেলওয়ে কোচ ফ্যাক্টরি টিটাগড় ওয়াগনস লিমিটেডের ২৫ বছর পূর্তির এক অনুষ্ঠানে তিস্তা নিয়ে ইঙ্গিত পূর্ণভাবে আক্ষেপ করেন মমতা।

মমতা বলেছিলেন, ‘তিস্তায় ছোট বড় বেশ কয়েকটি ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে আরও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সিকিম সমস্ত পাওয়ার প্রজেক্ট তিস্তা নদীর ওপরে নির্মাণ করবার ফলে আমাদের আর কোনোও জায়গা নেই।’

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক দিল্লি সফরে সোমবার পর্যন্ত আমন্ত্রণ পাননি মমতা। তবে ভারত সফরের মাসখানেক আগেও চিঠি চালাচালি হয়েছে মমতা-শেখ হাসিনার। চিঠিতে মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখনই তিস্তা ইস্যুতে ফের জল্পনা দানা বাঁধতে শুরু করে।

এর পরেই হিন্দু মোটরে তিস্তার পানি চুক্তি সম্পর্কে সরাসরি নেতিবাচক মন্তব্য না করে ইঙ্গিত পূর্ণভাবে প্রতিবেশী রাজ্য সিকিমের ঘাড়ে বন্দুক রেখে তিস্তার পানি প্রবাহ কমে যাওয়া নিয়ে তার মন্তব্যকেই সীলমোহর দেযন মমতা। এমন অবস্থায় আলোচনার টেবিলে সিকিমকে বাইরে রেখে মমতাকে বাইপাস করে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে তিস্তা চুক্তির আলোচনা আদৌ কতটা প্রাসঙ্গিক হবে সেটা সময় বলবে।