ড. আকবর আলি খান দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। এ জন্য তাঁর মৃত্যুর খবরটি আমার কাছে আকস্মিক ছিল না। তবুও এই মৃত্যু আমাকে বেদনাহত করেছে। তাঁর মৃত্যুতে মনে হচ্ছে, আমি স্বজনহারা হয়েছি। সত্যিকার অর্থেই আমি স্বজন হারানোর শোক অনুভব করছি। তিনি একজন অতি পণ্ডিত লোক ছিলেন। সব পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। বিশেষ করে অনার্স ও মাস্টার্সে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। এ ছাড়াও তৎকালীন প্রবেশিকা বা মাধ্যমিক পরীক্ষা ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাতেও ভালো ফল করেছিলেন। তিনি সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে তাতে চান্স পাওয়াটা অনেক দুরূহ। শক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছিল সেটি। সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে তিনি প্রশিক্ষণ শেষ করে প্রথম পোস্টিং পান হবিগঞ্জে। সেখানে তিনি মহকুমা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মহকুমা প্রশাসক হিসেবে তিনি একটি গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেটি হলো ১৯৭০-এর নির্বাচন। সেই নির্বাচনে তিনি তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন। তারপরই বাঙালি জাতির সামনে চলে আসে মুক্তিযুদ্ধ। সেই সময়ে যখন কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়মতান্ত্রিক দায়িত্ব পালন বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি, তখন তিনি বাংলাদেশের পক্ষে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। নিজের অধীনের মহকুমাকে বাংলাদেশের জন্য ব্যবহার শুরু করেছিলেন। তিনি মহকুমা খাদ্যগুদাম থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে খাদ্য সরবরা করেন। সেখানে থাকা সরকারি অস্ত্রও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পাঠিয়ে দেন। সেই সময়ে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ভল্টে থাকা দুই কোটি পাকিস্তানি রুপি আগরতলায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এই অর্থ মুজিবনগর সরকারের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে তিনি আগরতলা হয়ে কলকাতা যান। সেখানে মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রতিরক্ষা বিভাগের উপসচিব হিসেবে কাজ করেন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। পরে এক সময় তিনি শিক্ষকতায় যুক্ত হন। আবার পিএইচডি করতে দেশের বাইরে যান। দেশে ফিরে তিনি সরকারের বিভিন্ন পদ যেমন- অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক বিভাগের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, অর্থ বিভাগের সচিব ও কেবিনেট সচিব; বিশ্বব্যাংকে বিকল্প নির্বাহী পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০৬ সালে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়, তখন তিনি তার একজন উপদেষ্টা ছিলেন। আমি তখন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তাঁর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ ব্যক্তিগতভাবে আমার তখনই ঘটে। তখন উপদেষ্টা পরিষদের যে সভা হতো, তাতে আমার উপস্থিত থাকতে ও সভার কার্যবিবরণী লিখতে হতো। আরও কোনো নির্দেশনা থাকলে তা লিপিবদ্ধ করতে হতো। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তাল সময়ে আকবর আলি খানসহ অন্য উপদেষ্টা হাসান মশহুদ চৌধুরী, সুলতানা কামাল ও সিএম শফি সামি একযোগে পদত্যাগ করেছিলেন। সেই চারজনের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে নিয়ে যাওয়া এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর তা আবার নিয়ে আসা; সেই পদত্যাগপত্র গেজেট আকারে প্রকাশ করতে হয়েছিল। তখন দেশের বৃহৎ দুই রাজনৈতিক শক্তি পরস্পর সংঘাতমুখর পরিবেশে ছিল। সার্বিক পরিস্থিতি দিন দিন উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। সেই সময়ে তাঁদের পদত্যাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছিল বলে আমার মনে হয়। এর পরই এক-এগারোর ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময় থেকে আমরা ভিন্ন এক আকবর আলি খানকে দেখেছি। তিনি তখন লেখালেখিতে আরও গভীরভাবে নিজেকে নিয়োজিত করতে শুরু করেছিলেন। একটা সময়ে সরকার রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশন গঠন করেছিল। আকবর আলি খানকে এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেখান থেকে অবসর নেওয়ার পর তাঁকে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, বিভিন্ন বই রচনা, সভা-সেমিনারে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দিতে দেখেছি। ২০০৯-এ যখন নির্বাচিত সরকার এলো, তখন থেকে তিনি এক ধরনের দায়মুক্তভাবেই এসব করতে পারতেন। তবে এই সময়ে তিনি শারীরিকভাবে বাধাগ্রস্ত হন। প্রথমে হাতে সমস্যা দেখা দেয়, পরে আরও বেশকিছু সমস্যা দেখা দেয়। এই সময়ে তিনি কিছু হৃদয়বান মানুষের দেখা পান। যাঁরা তাঁর লেখালেখি চালিয়ে নিতে সহায়তা করেছেন। কম্পিউটার থেকে শুরু করে লোকবল- সবকিছু দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে, যাতে তিনি সার্বক্ষণিক লেখার কাজটি চালিয়ে যেতে পারেন। শারীরিকভাবে সক্ষমতা কিছুটা কমে এলেও তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক রচনা সমানভাবে চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো তাঁর একমাত্র কন্যা এবং স্ত্রী অল্প বয়সেই তাঁকে একা করে চলে গিয়েছিলেন। তাঁরা দু'জনেই অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে দুরারোগ্য ব্যাধিতে মারা যান। শেষ বয়সে তিনি তাঁর শতবর্ষী শাশুড়িকে নিয়ে থাকতেন।
তাঁর সম্পর্কে একদিক থেকে মূল্যায়ন করা কষ্টসাধ্য। তিনি ইতিহাসের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তাই ইতিহাসটা তাঁর জানা ছিল। আবার অর্থনীতিতে পিএইচডি করেছিলেন। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকালে অর্থনীতির নীতিনির্ধারণী পদে ছিলেন বলে অর্থনীতিটাও ভালো বুঝতেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্য চিন্তার পাশাপাশি এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ নিয়েও তিনি ভাবতেন। যতদিন শারীরিক সক্ষমতা ছিল; সভা-সেমিনারে উপস্থিত হয়ে অকুতোভয় যেটাকে বলে, সেভাবে তিনি কাজ করেছেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্র কীভাবে সুরক্ষিত হবে; সুশাসন কীভাবে নিশ্চিত হবে; নাগরিক অধিকার কীভাবে রক্ষিত হবে; অর্থনৈতিক সংকট কী করে কাটিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে- এ বিষয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব ভাবনার কথা প্রকাশ করতেন। কে কী মনে করবে- এটা কখনও ভাবেননি তিনি। বাংলাদেশের কী করে ভালো হবে, এটাই ছিল তাঁর আরাধ্য। দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব চিন্তা প্রকাশ করতেন। সেই সঙ্গে কোন পথে হাঁটলে বাংলাদেশ লক্ষ্যচ্যুত হবে না, তা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে গেছেন। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন যাতে ইভিএমে না হয়, এমন পরামর্শ তিনি দিয়েছিলেন। আগামী নির্বাচন ইভিএমে না করতে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের ৩৯ জন নাগরিকের একটি প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনের কাছে দেওয়া হয়েছিল। সেই তালিকায় আকবর আলি খানের সঙ্গে আমার নামটি থাকায় আমি নিজেকে গর্বিত মনে করছি।
আমি মনে করি, তিনি একজন সফল প্রশাসক, নির্মোহ ইতিহাসবিদ ও আদর্শ অর্থনীতিবিদ ছিলেন। এসব দিয়েই তিনি বাংলাদেশের সেবা করে গেছেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই জায়গাটিতে শূন্যতা দেখা যাবে। এই শূন্যতা সহজেই কাটিয়ে ওঠা যাবে না। তবে তিনি বিভিন্ন সময়ে তাঁর লেখালেখি, কাজ ও বক্তব্যের মধ্য দিয়ে যেসব বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে গেছেন, সেসব যেন আমরা যথাযথভাবে পালন করতে পারি। আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করবেন বলে আমি আশা করি। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
আলী ইমাম মজুমদার :সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব