সকালটা ছিল রোদেলা। দুপুর গড়াতেই মেঘে ঢাকা পড়ে আকাশ, সঙ্গে মৃদু বাতাস। একসময় শুরু ঝুম বারিধারা। বুড়িগঙ্গাও যেন ফিরে পায় নবযৌবন। কিছু সময়ের জন্য কালচে নদীর জল হয়ে ওঠে টলমল। এমন আবহে বুড়িগঙ্গার জলে শত শত নৌকা নিয়ে উৎসবে মাতে একদল পরিবেশবিদ, স্থানীয় বাসিন্দাসহ নানা শ্রেণির মানুষ। গতকাল শনিবার সুসজ্জিত নৌকা শোভাযাত্রা রূপ নেয় উৎসবে। এ সময় বাউল আবদুর রহমান বয়াতি গানে গানে ছড়িয়ে দেন নদী রক্ষার বার্তা। শতাধিক নৌকার শোভাযাত্রাটি ঠোডা গুদারাঘাট থেকে বাবুবাজার ব্রিজ ঘুরে খোলামোড়া ঘাট পর্যন্ত নদীর দু'পাশ প্রদক্ষিণ করে। 'দূষণমুক্ত বুড়িগঙ্গা নদী, ঢাকাবাসীর প্রাণের দাবি' স্লোগানে একাত্মতা প্রকাশ করে বিভিন্ন সংগঠন।

এর আগে সকালে কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ টাওয়ার মাঠে দূষণমুক্ত নদীর প্রত্যয়ে 'বুড়িগঙ্গা নদী কার্নিভাল' উপলক্ষে আলোচনা সভায় নদী বাঁচানোর দাবি ওঠে। ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ কনসোর্টিয়াম এবং বুড়িগঙ্গা নদী মোর্চা আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল। ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ কনসোর্টিয়াম লিড শরীফ জামিলের সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য মো. কামরুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবীর, ইউএসএআইডি বাংলাদেশের ডেমোক্রেসি ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স ডিরেক্টর ক্রিস্টিন ম্যাকরে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম তালুকদার ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক কামরুজ্জামান মজুমদার।

সুলতানা কামাল বলেন, 'নদী নিয়ে আমরা সচেতন নই। আমাদের কারও ছাগল হারিয়ে গেলে মামলা করি, নালিশ করি। তবে আমাদের নদী হারিয়ে যাচ্ছে, তাতে মামলা করছি না। কোনো কিছুই মনে করছি না।'

তিনি বলেন, 'সরকারের সঙ্গে নাম যুক্ত হলেই আমরা অন্যায় কাজ করতে পারি কেন। কারণ, কিছুই হয় না- এ সংস্কৃতি চালু হয়ে গেছে। আমাদের এ সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যে দল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, সে দলের নাম ভাঙিয়ে কেন নদী দখল হবে। নদী বাঁচানোর আন্দোলন শুধু আমাদের কিছু পরিবেশবাদীর নয়। এ নদী সবার, আন্দোলনও সবার।'

সংসদ সদস্য কামরুল ইসলাম বলেন, 'এসব দখলবাজ কোনো দলের নয়, এরা সব সরকারেরই পিঠে সওয়ার হয়। লন্ডনের টেমস নদী দখলমুক্ত করতে ৪০ বছর লেগেছে, আর চীনের হোয়াংহো নদী দখলমুক্ত করতেও অনেক সময় লেগেছে। আমরা বুড়িগঙ্গাকে দখলমুক্ত করেই ছাড়ব।' তিনি বলেন, 'আদি চ্যানেল উদ্ধারের কাজ চলছে। এতে অনেকের বাড়িঘর ভাঙা পড়বে, তবে কেউ আমাদের সাহায্য পাবেন না। চারদিকে রাস্তা হবে, ওয়াটার বাস চালু হবে পুরোপুরি।'

বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলী ও ড্রেজিং প্রকল্পের প্রধান রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, 'বুড়িগঙ্গা নদীকে প্রাণ দিতে ইতোমধ্যে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র থেকে পানি এনে বুড়িগঙ্গাকে সচল করতে কাজ করছে সরকার। শিগগিরই এ কর্মযজ্ঞ ঢাকাবাসীর চোখে পড়বে।'