এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আমার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়। আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার গর্বের বিশ্ববিদ্যালয়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের দিনগুলো কখনও ভুলবার নয়। এত গেল ব্যক্তির অভিব্যক্তি, আর সামগ্রিকভাবে বিচার করলে বলতে হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। এ লেখাটার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমার কিছু অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করা যা গৃহীত হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকর্ষ সাধনে সহায়ক হতে পারে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, একটা বুদ্ধিবৃত্তিক রাষ্ট্র গঠন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারের পতন এবং আরও কত কিছুতেই না অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এটা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, আগামীতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের পথ চলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারবে। ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ১০২তম জন্মদিন পালন করেছে- অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ তার বর্তমান অবস্থানে এসেছে, আগামীতে পাড়ি দিতে হবে আরও অনেক পথ এই প্রতিষ্ঠানটিকে। পুথিগত ভাষায় সংক্ষেপে একটা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- (১) একদল মানুষের মিলন ক্ষেত্র; (২) কার্যসম্পাদনে যাঁরা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল; (৩) এক বা একাধিক উদ্দেশ্য সম্পাদনে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালিত করা; এবং (৪) সমাজের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত পণ্য উৎপাদন করা। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটা হচ্ছে সমাজের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত স্নাতক তৈরি করা, যারা সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে; সমস্যা সমাধানে নেতৃত্ব দেবে এবং উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। উপযুক্ততা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। উপযুক্ত পণ্য উৎপাদনে বা সেবা প্রদানে কখনও কখনও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সক্ষমতার উন্নয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়- যার অভাবে এই বিশ্বায়নের যুগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়ে। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোয়াককোয়ারেল সাইমন্ডসসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান সম্মানজনক পর্যায়ে না থাকায় অনেকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হতে শুরু করেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি আগামী দিনের সমাজ উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম! এটা একটা অনেক জটিল প্রশ্ন এবং এর উত্তরও কিন্তু খুব সহজে দেওয়া সম্ভব না। তবে এখানে একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন, আমরা যখন কোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে আলোচনা করব, তখন কিন্তু শুধু সেই প্রতিষ্ঠান নয়, আরও দেখতে হবে যে (১) সে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কারা জড়িত, (২) কীভাবে সে প্রতিষ্ঠানের কর্মী নিয়োগ হচ্ছে, (৩) কারা সে প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করছে, (৪) কোন কোন পদক্ষেপ সে প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, (৫) প্রতিষ্ঠানের কৌশল, (৬) আগামীর পরিকল্পনা এমন আরও অনেক কিছু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে সোনালি অতীত, জাতির বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে এই বিশ্ববিদ্যালয় পথ দেখিয়েছে। যুগোপযোগী প্রতিষ্ঠানিক কৌশল, পরিকল্পনা এবং কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে অতীতের মতো আগামীতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় পর্যায়ে তো বটেই, এমনকি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আন্তর্জাতিক ভূমিকা হতে পারে যৌথ গবেষণা, কৌশলগত উদ্ভাবন ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন। মনে রাখতে হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের একটি জাতীয় সম্পদ- অনেক দেশবরেণ্য ব্যক্তি এখানের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ পরিচালনা করেছেন এবং করছেন, আগামীর মানবসম্পদেরও একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখান থেকেই বের হবে। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং এর গ্রহণযোগ্যতার বৃদ্ধি অপরিহার্য- স্বপ্ন হবে একটা বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটা কার্যকরী বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রকল্প কিন্তু এক দিনে বা এক বছরে বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে না। এটা হবে একটা দীর্ঘকালীন এবং জটিল প্রক্রিয়া। তবে শুরু করতে হবে এখনই অন্যথায় বাংলাদেশের মানবসম্পদ বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনের দৌড়ে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বে। বাংলাদেশ একটি রক্ষণশীল সমাজ, যেখানে যে কোনো ধরনের সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনকে দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করা হয়। এই পরিবর্তন প্রতিরোধের আচরণের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে উচিত হবে আমূল পরিবর্তনের (জধফরপধষ পযধহমব) পরিবর্তে ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনের (ওহপৎবসবহঃধষ পযধহমব) প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থের প্রয়োজন হয়। তবে অর্থই কিন্তু সবকিছু না, দরকার হয় ইচ্ছা শক্তি, নেতৃত্ব, কর্মপন্থা, স্বপ্ন, প্রেরণা যেগুলোকে বলা হয়, সফট বিষয়। সফট বিষয়গুলো থাকলে, অর্থের সংস্থান হয়ে যায়। কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটা বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রকল্প শুরু হতে পারে? প্রথমত যা করা যায় তা হলো, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়ের মানদণ্ডগুলো ভালোভাবে বিশ্নেষণ করে বাস্তবায়নযোগ্য মানদণ্ডগুলোর একটা তালিকা প্রণয়ন করা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা যেতে পারে কোন মানদণ্ডগুলো স্বল্প মেয়াদে, কোনগুলো মধ্যম মেয়াদে এবং কোনগুলো দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এভাবে চিহ্নিত করার পর কোনো সময় নষ্ট না করে কাজ শুরু করতে হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধুই একটা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এখানে যা ঘটে তা অনেক সময় সমগ্র বাংলাদেশকে প্রভাবিত করে। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্য সব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুকরণীয়, অনুসরণীয় এবং প্রভাবক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও কাজ করে থাকে। যদিও এটা একটা কৌশলগত বিষয়, তবুও চিন্তা করা যেতে পারে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটা গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা যায় কিনা বর্তমান সময়ের শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত গবেষণার ফলাফল সমাজ এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে ব্যবহার করা যেতে পারে। অধিকন্তু, শিক্ষা বিজ্ঞানের শিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বেশি জোর দিতে পারে, যা দেশের শিক্ষার মান উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজ যত উন্নত হতে থাকে, সেই উন্নয়নকে ধরে রাখতে দক্ষতার প্রয়োজন তত বেশি হয়। উন্নত এবং বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা ছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব না। বিশ্বায়নের যুগে নেটওয়ার্কিং হচ্ছে শক্তি। তাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি কার্যকরী আন্তর্জাতিক অফিস প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ধীরে ধীরে তার অংশীদারদের সঙ্গে শিক্ষক-ছাত্র বিনিময় শুরু করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের কর্মে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিভাগীয় প্রধানদের নেতৃত্বে বার্ষিক 'উন্নয়ন আলোচনা ' প্রথা চালু করার কথা চিন্তাভাবনা করতে পারে। ফিনল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এটা অনুষ্ঠিত হয়। 'উন্নয়ন আলোচনার' নামে বিভাগীয় প্রধান তাঁর প্রতিটা অধস্তনের সঙ্গে বছরের শুরুতে একে একে মিলিত হয়ে আলোচনা করে বিগত বছর কেমন গেল, লক্ষ্যে পৌঁছাতে কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা এবং স্থির করে চলতি বছরের উন্নয়ন কর্মপন্থা কী হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি অধিক গতিশীল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের চেষ্টা করা যেতে পারে। আর এ জন্য দরকার বর্ধিত হারে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া- বৈচিত্র্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকে সৃজনশীলতা। প্রাতিষ্ঠানিক গতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য আমার বর্তমান কর্মস্থল তাম্পেরে ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপলায়েড সায়েন্সেসসহ  বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠানে এমন কৌশল সচরাচর অবলম্বন করতে দেখা যায়। অধিকন্তু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গতিশীলতা বাড়ানোর জন্য বহিরাগত পরিবর্তন এজেন্টও নিয়োগ করা যেতে পারে। গতিশীল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগামীর পরিবর্তিত পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমর্থ হতে পারে, এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে।