দেশে বিশ্বমানের ওষুধ তৈরি হওয়া সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না। দুর্বল বাজার তদারকির ফলে ওষুধের উচ্চমূল্য ও যত্রতত্র বিক্রি কমছে না। অপব্যবহার হচ্ছে। অনিরাপদ হয়ে উঠছে রোগীর সামগ্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনায় ওষুধের অপব্যবহার রোধ করা জরুরি এবং জনগণকে সচেতন করতে সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার।

গতকাল রোববার বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা। বিশ্ব রোগীর নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে ফার্মাকোভিজিলেন্স ও বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগিতায় এই আয়োজন করে সমকাল।

বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-উর-রশিদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক আহমেদুল কবীর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. টিটো মিঞা, সোসাইটি অব সাইকিয়াট্রিস্ট বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (সেলস ও মার্কেটিং) এস এম মাহমুদুল হক পল্লব, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের অধ্যাপক সুকল্যাণ কুণ্ডু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল, গাইনোকোলজি, অবসটেট্রিকস বিশেষজ্ঞ ও সার্জন এবং এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. গুলশান আরা প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমকালের সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান শেখ রোকন।

মোজাম্মেল হোসেন বলেন, আজ একটি বিচিত্র বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এখানে চিকিৎসা নয়, রোগীর নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। যেসব ওষুধ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া দোকান থেকে কেনা যায়, ঢাকার বাইরে সেসব ওষুধের নকল ব্যাপক হারে তৈরি হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে কম মূল্যে বেশি বিক্রি হয়। এটা রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অভাবের একটি দিক। এ ছাড়া নকল ওষুধ, ভুয়া চিকিৎসক, ওষুধ উৎপাদনে মান নিয়ন্ত্রণ, সঠিক মাত্রায় উপাদানগুলো ব্যবহার হচ্ছে কিনা, সরকারি সংস্থা ঠিকভাবে তদারকি করছে কিনা- এসব বিষয়ে ঔষধ প্রশাসনের বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যে মূলধারায় কিছু অগ্রগতি হচ্ছে। কিন্তু তার সঙ্গে কোনো কিছুর অপব্যবহার বা নানা মাত্রায় দুর্নীতি হচ্ছে। সেটির বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই সামনে করতে হবে।

অধ্যাপক ডা. হারুন-উর-রশিদ বলেন, ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো নমুনা ওষুধ চিকিৎসকের চেম্বারে কেন দেয়? এটি কোনো কাজেই আসে না। এর মাধ্যমে টাকার বড় অংশ অপচয় হচ্ছে। অনেক চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রে প্রয়োজন ছাড়াই মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ লেখেন, এটি বন্ধ হওয়া জরুরি। সঠিক রোগ শনাক্ত না হওয়ায় রোগীর ভোগান্তি হচ্ছে। এ জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতাল নিবন্ধন প্রক্রিয়া একটু সহজ করতে হবে।

অধ্যাপক আহমেদুল কবীর বলেন, ওষুধ অনেক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে বাজারে আসে। এর পরও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। এ ক্ষেত্রে কিছু সমাধান করা যায়, কিছু সমাধানযোগ্য নয়। এমন অনেক ওষুধ রয়েছে, দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এমনকি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি এমন অনেক ওষুধ সেবনেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই জায়গায় ফার্মাসিস্ট যদি দক্ষ না হন, তাহলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, এমন ওষুধ রয়েছে অনেক ভালো; কিন্তু নির্দিষ্ট রোগ সারাতে সাহায্য করলেও অন্য কোনো রোগ বাড়াতে সহায়তা করে। কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে আরও সচেতন হতে হবে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ঔষধ প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানো। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অনেকেই ওষুধ দিচ্ছেন। এটি বন্ধে উদ্যোগ নিয়েছি। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো অবস্থাতেই ওষুধ বিক্রি করা যাবে না। আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না গেলে ওষুধের অপব্যবহার বাড়বে। অবৈধ হাসপাতাল বন্ধে শক্ত অবস্থানে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কোনো অবস্থাতেই রোগীর সঙ্গে প্রতারণা করার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে জানান ডা. আহমেদুল কবীর।

অধ্যাপক ডা. মো. টিটো মিঞা বলেন, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া শনাক্ত করে এর ওপর কাজ করে বিষয়টি বোঝা এবং সর্বোপরি এটি প্রতিরোধ করা- এগুলো সবই চলমান প্রক্রিয়া। এটি যেমন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব, তেমনি ঔষধ প্রশাসনসহ অন্যান্য অংশীজনও কাজ করে থাকেন। রোগীদের নিরাপত্তায় যেমন চিকিৎসকদের ভূমিকা রয়েছে; তেমনি ফার্মাসিস্ট, ঔষধ প্রশাসনসহ অন্যদেরও ভূমিকা রয়েছে।

অধ্যাপক ডা. মো. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী বলেন, অনিরাপদ সেবা অল্প বয়সে মৃত্যুর অন্যতম কারণ। ওষুধ প্রয়োগের নৈপুণ্য বা দক্ষতা নির্ভর করে দুটি জিনিসের ওপর। একটি হচ্ছে সঠিক রোগ নির্ণয়; অন্যটি হলো মূল উপসর্গ নিশ্চিত করা।

মাহমুদুল হোক পল্লব বলেন, আমরা সব সময় রোগীদের যেমন সুস্থ করতে চাই, একই সঙ্গে তাঁদের নিরাপত্তা চাই। এ জন্য চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রোগীর নিরাপত্তায় চিকিৎসকের করণীয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক ওষুধ প্রয়োগে তাৎক্ষণিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। সে জন্য এগুলো প্রয়োগের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকতে হবে।

অধ্যাপক ডা. গুলশান আরা বলেন, ওষুধ খাতে চারটি বিষয়ে নিরাপত্তার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথম হলো ব্যবস্থাপত্র, দ্বিতীয়ত ডিসপেন্সিং, তৃতীয়ত প্রশাসন এবং চতুর্থ মনিটরিংয়ের সময় সতর্কতা। এগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকলে রোগীর নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে।

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল বলেন, আমাদের গবেষণার জায়গায় গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। শুধু অ্যালোপ্যাথিক গবেষণাতেই গুরুত্ব দিলে হবে না। কেননা বাংলাদেশ এমন একটি ভূখণ্ড, যেখানে হেকিমি ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের একটা বিরাট উপস্থিতি ছিল। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে আয়ুর্বেদ মন্ত্রণালয় রয়েছে। এই শাস্ত্রেই তাদের যে আয়, তা আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। তারা যদি ওই শাস্ত্র নিয়ে এত আয় করতে পারে, তাহলে আমাদের দেশে তো দুটি শাস্ত্রের উপস্থিতি ছিল। কিন্তু আজ আমাদের অভিজ্ঞতা কী? আজ আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, আমরা এটা প্রচার করি- 'গাছ-গাছড়া খাবেন না, বনাজ খাবেন না।' এটা তো হতে পারে না। আমার কাছে মনে হয়, এই জায়গায় একটি সমন্বিত গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

ডা. মেখলা সরকার বলেন, মানসিক রোগের চিকিৎসায় ওষুধগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক বেশি। অনেক সময় মানসিক রোগী সঠিক সমস্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। উপসর্গ দেখে ওষুধ দিলে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এ ছাড়া মানসিক রোগ নিয়ে মানুষ সচেতনতার অভাবে চিকিৎসকের কাছে আসে না। নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ সেবন করে। এতেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকের কাছে ঠিকমতো ফলোআপে না এসে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করেন। আমাদের চিকিৎসক ও গবেষক সংকট রয়েছে। রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এসব বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অধ্যাপক সুকল্যাণ কুণ্ডু বলেন, রোগীদের ওষুধ সেবনের সঠিক বিধান জানার বিষয়ে ফার্মাসিস্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ দেশে এ, বি ও সি- তিন ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট রয়েছেন। কমিউনিটি ফার্মেসিগুলোর 'এ' ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্টদের নেওয়ার সক্ষমতা নেই। যার জন্য রোগীর কাউন্সেলিং সঠিকভাবে হয় না। অনেক সময় চিকিৎসকরা রোগীর সঠিক ইতিহাস জানতে পারেন না, সমস্যা বুঝে ওষুধ দেন। এ ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রোগীরা কীভাবে সঠিক নিয়মে ওষুধ সেবন করবেন- এ বিষয়ে ফার্মাসিস্টরা রোগীকে পরামর্শ দিতে পারেন। উন্নত দেশগুলোতে চিকিৎসকরা ওষুধ লিখে দেওয়ার পরও ফার্মাসিস্টরা রোগ অনুযায়ী সঠিক ওষুধ এবং সঠিক ডোজের কথা লিখেছেন কিনা- তা পুনর্নিরীক্ষণ করেন। এ দেশের প্রেক্ষাপটে রোগীদের ফার্মাসিস্টদের পক্ষ থেকে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয় না।