দেশে এ পর্যন্ত ২০ লাখের বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। তাদের বড় একটি অংশের বয়স ষাটোর্ধ্ব। এ ভাইরাস থেকে সুস্থ হলেও নানা জটিলতায় ভুগছেন অনেকে। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোভিডের বিরূপ প্রভাবে স্মৃতিভ্রম সমস্যা বেশি দেখা দিয়েছে। দেশে সম্প্রতি কোনো গবেষণা বা জরিপ না থাকায় কি পরিমাণ বেড়েছে এটা না বলা গেলেও এই রোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ বলছে- দেশে স্মৃতিভ্রম রোগী সংখ্যা উদ্বেগজনক বেড়েছে।

করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ডিমেনশিয়া লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসা মানুষের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। গত চার-পাঁচ মাস ধরে আগের চেয়ে তিন থেকে চারগুণ রোগী বেশি পাচ্ছেন চিকিৎসকরা। এই চিকিৎসায় জড়িত ১০ জনের বেশি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল প্রতিবেদক। সব চিকিৎকের পর্যবেক্ষণ একই।

এ বিষয়ে নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সেলিম শাহী সমকালকে বলেন, ডিমেনশিয়া আক্রান্ত রোগী স্মরণশক্তি ক্রমেই লোপ পায়। বিচার বিশ্লেষণ শক্তি কমে যায়। মেজাজ ও আচারণ পরিবর্তন হয়। কথাবার্তা ও শব্দচয়নে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। পরিচিত ছবি বা সংকেত সতর্কীকরণে দৃষ্টিভ্রম দেখা দেয়। স্থান ও সময় নিয়ে বিভ্রান্ত তৈরি হয়। জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলা ও খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। এছাড়া পরিবারের প্রিয়জন কিংবা প্রতিবেশী কোনো বয়স্ক মানুষ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পথ ভুলে যাচ্ছেন। বাড়ি ফিরে আসতে পারছেন না। মাঝেমধ্যে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন। অতি পরিচিতজনকেও চিনতে পারছেন না। কথা বলতে গিয়েও মাঝেমধ্যে আটকে যাচ্ছে। মন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই। এ ধরনের স্মৃতিলোপ পাওয়া ব্যক্তির বয়স যদি ৬০ বছরের বেশি হয় এবং সমস্যাগুলো যদি ঘনঘন অনুভূত হয়, তাহলে বুঝতে হবে তিনি আলঝেইমারস বা ডিমেনশিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে রোগটি নিয়ে সচেতনতামূলক তেমন কোনো কর্মসূচি নেই। এ কারণে রোগটির ভয়াবহতা ও প্রতিকার সম্পর্কে মানুষের মধ্যে তেমন ধারণা তৈরি হয়নি।

চিকিৎসকরা বলছেন, বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিস্কের কোষ বা নিউরনগুলো শুকিয়ে যেতে থাকে। ফলে স্মৃতিলোপ পায়। আলঝেইমারস বা ডিমেনশিয়ার বিশেষত্ব হলো ভুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন ঘটে। মস্তিস্কের সামনের অংশ ব্যক্তিত্ব গঠনে সাহায্য করে। আলঝেইমারস রোগে এই অংশের ক্ষতি হয়। ফলে ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন ঘটে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৮০ বছরের পর থেকে মস্তিস্কে ছোট ছোট স্ট্রোকের ফলে কোষ শুকিয়ে যেতে থাকে, তখন এ রোগের লক্ষণ দেখা দেয়।

ওয়ার্ল্ড আলঝেইমারস অ্যাসোসিয়েশন তথ্য বলছে, বিশ্বের স্মৃতিভ্রম রোগে (ডিমেনসিয়া) আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৫ কোটি। ২০৫০ সাল নাগাদ এই রোগীর সংখ্যা ১৫ কোটি ছাড়াবে। এ ছাড়া প্রতি সেকেন্ডে নতুন করে ৬৮ জন এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রতি নয়জনে একজন করে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশে এই রোগী ৫ লাখ। নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের ২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ৬০ বছরের ওপরের বয়সী মানুষের মধ্যে ৮ দশমিক ১ শতাংশ আলঝেইমারস বা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত।

২০২১ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে আইসিডিডিআরবি ও জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট মিলে একটি গবেষণা করা হয়। এই গবেষণায় দুই হাজার ৭৯৬ জন সাক্ষাৎ নেওয়া হয়। গবেষণার বিষয়ে নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সেলিম শাহী জানান, গবেষণায় দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ রোগী রাজশাহী বিভাগের বাসিন্দা। এরপর পর্যায়ক্রমে রংপুরে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ, খুলনায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, বরিশালে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, সিলেটে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ঢাকায় সবচেয়ে কম ২ দশমিক ৯ শতাংশ রোগী পাওয়া গেছে।

ডা. সেলিম শাহী বলেন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, লিভার ও কিডনি সমস্যা, থাইরয়েড ও হরমোনাল সমস্যা থাকা ব্যক্তির ডিমেনশিয়ায় আক্রান্তে শঙ্কা বেশি। সুতরাং এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসা নিতে হবে। একই সঙ্গে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। এই রোগ একবার হলে আজীবন বহন করতে হয়। তিনি আরও বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ আলঝেইমারস রোগে আক্রান্ত। ডায়াবেটিস হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ অন্তত একশ রোগ এই ডিমেনশিয়া সৃষ্টির জন্য দায়ী। বর্তমানে দেশে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এই দুটি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আলঝেইমারস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনা প্রভাবে আগের চেয়ে ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে এটা সত্যি। আন্তর্জাতিক গবেষণায় এর প্রমাণও পাওয়া গেছে। আমাদের চেম্বারে রোগীর আসার সংখ্যাও বেড়েছে। তবে এটি নিয়ন্ত্রণে সরকারের দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি নেই। তিনি আরও বলেন, আলঝেইমারস রোগে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে আসতে হবে।আক্রান্ত ব্যক্তির পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাবার, মলমূত্র ত্যাগ ইত্যাদির ওপর নজর রাখতে হবে। এ সময় পুষ্টি বজায় রাখা খুব জরুরি। বিষাদে আক্রান্ত হলে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট এবং ভিটামিনের প্রয়োজন হয়। অ্যাসিটাইলকোলিন নিঃসরণ বাড়ানোর জন্য কোলিনার্জিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়। তবে ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে স্মৃতিশক্তি বৃষ্টির জীবনযাত্রার মান উন্নত করা গেলেও রোগের চলমান ক্ষয়রোধ করা সম্ভব হয় না।

এমন প্রেক্ষাপটে 'ডিমেনশিয়াকে জানুন অ্যালঝেইমারসকে চিনুন' - এই প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব আলঝেইমারস দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে আজ বুধবার জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সকাল সাড়ে ৯ টায় র‌্যালি হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ১০ টায় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা বলেছে ডেপটি স্পিকার শামসুল হক টুকু।