গাজীপুর ও টঙ্গীর ৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকছে বায়ুদূষণে। পুরো নগরের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো এখন ধুলোমাখা। কেউ কারখানার বর্জ্য ফেলছে নদীতে, কেউ বা ময়লা-আবর্জনা ফেলছে রাস্তায়। নেই কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। চলছে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ। দূষণ ছড়াচ্ছে কলকারখানাও। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার গাজীপুরে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে 'বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব এবং আমাদের করণীয়' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখান থেকে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ জোরদার, সচেতনতা বাড়ানো, আইন প্রয়োগে কঠোর হওয়াসহ নানা প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বায়ুদূষণ রোধে সম্মিলিত উদ্যোগের পাশাপাশি গাজীপুরকে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার প্রস্তাবও উঠে আসে এতে।

দৈনিক সমকাল ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান। বক্তব্য রাখেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র আসাদুর রহমান কিরন, জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান, চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি অ্যাডভোকেট আনোয়ার সাদাত, ট্রাফিক পুলিশের ডিসি মো. আলমগীর হোসেন, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (গবেষণা ও সম্প্রসারণ) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী, ওয়ার্ল্ড ভিশনের আরবান প্রোগ্রামের টেকনিক্যাল ম্যানেজার জোয়ানা ডি রোজারিও, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আকবর হোসেন, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম, নগর পরিকল্পনাবিদ সুমনা শারমিন ও গাজীপুর হায়দারাবাদ জামে মসজিদের খতিব মাওলানা নূরুল আমীন। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়ার্ল্ড ভিশনের ডেপুটি ডিরেক্টর মঞ্জু মারিয়া পালমা।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র আসাদুর রহমান কিরন বলেন, সারাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশন গাজীপুর। অথচ সারাদেশের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত শহর এটি। এখানে ৩ হাজারেরও বেশি শিল্পকারখানা আছে। অনেক মেগা প্রকল্প চলছে। অন্যান্য কারণের পাশাপাশি গাজীপুরে আরটি প্রকল্পও দূষণের জন্য বেশি দায়ী। তিনি আরও বলেন, নাগরিকদের প্রধান সেবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। অথচ এখানে ব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল। ডাম্পিং স্টেশনের জন্য জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম শেষ করতে পারলেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক হবে।

গাজীপুর জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান বলেন, এ শহর অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। ৫২৭টি কারখানায় ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে, আমরা তাদের মনিটরিং করতে পারি না। তাদের বর্জ্য খাল-নদীতে যাচ্ছে। দুর্বল আইনের কারণে অনেক সময় তাদের ধরা যায় না। তবে আগামী দুয়েক মাসের মধ্যে যেসব শিল্পকারখানা দূষণ ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান বলেন, আমরা পরিকল্পিত নগর চাই। জনবান্ধব নগর গড়তে দরকার নানা পদক্ষেপ। দূষণ প্রতিরোধের জন্য আইন আছে, কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। আইন প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার। গাজীপুরকে দূষণমুক্ত করতে প্রয়োজন নাগরিক আন্দোলন। যে আন্দোলনের চাপের মুখে সতর্ক হয়ে উঠবে সংশ্নিষ্ট প্রশাসন।

গাজীপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার সাদাত বলেন, শিল্পকারখানাগুলোকে মনিটরিং করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এক সময় ছিল না। এখন আমাদের ওয়াশিং, ডায়িং ও কেমিক্যালের জন্য একটি নির্দিষ্ট এলাকা দরকার। শিল্পকারখানা যদি বায়ুদূষণ করে তাহলে আমরা সব কারখানা ওই এলাকায় স্থানান্তর করব। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে ওয়ার্ল্ড ভিশনের ডেপুটি ডিরেক্টর মঞ্জু মারিয়া পালমা বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর বায়ুদূষণজনিত অসুখের কারণে ৮২ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। যাঁর মধ্যে বেশির ভাগই শিশু ও বৃদ্ধ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বায়ুদূষণজনিত কারণে উদ্বেগজনকভাবে মানুষের মৃত্যু বৃদ্ধি পেয়েছে। বায়ুদূষণবিষয়ক গ্লোবাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ সালে ১ লাখ সাড়ে ৭৩ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৫০ হাজার বেশি।