২০০৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০ বছর যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের প্যাথলজিস্টের দায়িত্ব পালন করেছেন ডা. হাসান আব্দুল্লাহ। বুধবার ছিল তাঁর চাকরির শেষ দিন। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে যান ছাড়পত্র সই করাতে। তখন তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান জানান, ডা. হাসানের বিরুদ্ধে সকালেই তিনি একটি বিভাগীয় মামলা চালু-সংক্রান্ত নোটিশে সই করেছেন। মামলার আসামি করা হয়েছে ডা. হাসান ও প্যাথলজি বিভাগের ইনচার্জ গোলাম মোস্তফাকে।

তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা করোনা পরীক্ষার ইউজার ফির ২২ লাখ ১৬ হাজার ৭২৩ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পরে উপায়ান্ত না দেখে প্যাথলজি বিভাগের টেকনিশিয়ান মোজাম্মেল হোসেনের কাছে কাগজপত্রসহ বিভাগের দায়িত্ব দিয়ে ডা. হাসান হাসপাতাল ত্যাগ করেন।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান বলেন, করোনা পরীক্ষার অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় অডিট আপত্তি আসে মন্ত্রণালয় থেকে। পরে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়।

তিনি বলেন, ডা. হাসান অবসরজনিত কোনো কাগজপত্র হাসপাতালে বা প্রশাসনে জমা দেননি। বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তি করে ছাড়পত্র নিয়ে অবসরজনিত কাগজপত্র হাসপাতালে দিলে তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে।

হাসপাতালের প্রশাসনিক ও হিসাব শাখা সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতাল থেকে করোনার শুরুতে ২০২০ সালে ৮ হাজার ৯৭০ জনের আরটিপিসিআর পরীক্ষা করা হয়। ২০২১ সালে আরটিপিসিআর করা হয় ২৫ হাজার ৩২৩ জনের এবং ২০২২ সালে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে পরীক্ষা করা হয় ৪ হাজার ২৬৩ জনের। অর্থাৎ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে কেবল করোনার আরটিপিসিআর পরীক্ষা করা হয় ৩৮ হাজার ৫৫৬ জনের। এ রোগীদের কাছ থেকে ন্যূনতম ১০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা ফি নেওয়া হয়। কিন্তু ওই ফি সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি।

ইউজার ফি বাবদ ২২ লাখ ১৬ হাজার ৭২৩ টাকা অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়। দায়ী করা হয় প্যাথলজিস্ট ডা. হাসান আব্দুল্লাহ ও ইনর্চাজ গোলাম মোস্তফাকে। চলতি বছরের মার্চে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অর্থ শাখা থেকে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামানের কাছে এ-সংক্রান্ত চিঠি আসে।

চলতি বছরের ১২ মার্চ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুর রহিম মোড়লকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে অর্থ আত্মসাতের সত্যতা মেলে। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে মন্ত্রণালয় ডা. হাসান ও গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। ওই মামলার নথি গত সোমবার হাসপাতালে পৌঁছায়। তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান বুধবার নথিতে স্বাক্ষর করেন।

এ খবর জানার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন গোলাম মোস্তফা। তিনি স্ট্রোক করে চিকিৎসাধীন থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

হাসপাতালের পরিসংখ্যানবিদ আজগর আলী জানান, জনপ্রতি ১০০ টাকা হিসাব করলে রাজস্ব আয় আসার কথা ৩৮ লাখ ৫৫ হাজার ৬০০ টাকা। কিন্তু প্যাথলজি বিভাগ থেকে রাজস্ব জমা পড়েছে ১৮ লাখ ১২ হাজার ৩৮০ টাকা। বাকি ২০ লাখ ৪৩ হাজার ২২০ টাকার হিসাব দিতে পারেননি ডা. হাসান এবং গোলাম মোস্তফা।

তিনি জানান, করোনা পরীক্ষার কাজে সংশ্লিষ্টদের প্রাপ্য সরকারি কমিশনের ১ লাখ ১৫ হাজার ৪২০ টাকা বাদ দিলে ১৯ লাখ ২৭ হাজার ৮০০ টাকা রাজস্ব জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু প্যাথলজি বিভাগ থেকে বাকি ১৯ লাখ ২৭ হাজার ৮০০ টাকা জমা দেওয়া হয়নি, বা কোনো হিসাব দিতে পারছে না।

এ ব্যাপারে প্যাথলজিস্ট ডা. হাসান আব্দুল্লাহ বলেন, অবসরের দিন বিভাগীয় মামলার বিষয় জানতে পেরেছি। এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ছাড়পত্র পাইনি। তাই প্রাথমিকভাবে অবসরের কাগজপত্র ও দায়িত্ব প্যাথলজি বিভাগের টেকনিশিয়ান মোজাম্মেল হোসেনকে বুঝিয়ে দিয়েছি।