ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসের সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. তৈয়ব আলীর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়, ভুয়া বিল পেশ, কার্যালয়ের নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের কাছে ঘুষ দাবি, দুর্ব্যবহার, ক্ষমতার দাপট দেখানোসহ নানা অভিযোগ তুলে রোববার উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানকে চিঠি দিয়েছেন প্রধান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহালুল হক চৌধুরী।

চিঠিতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে তাকে অন্যত্র বদলি করার অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিতে বাহালুল হক চৌধুরীসহ তার কার্যালয়ের ১৩৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী স্বাক্ষর করেন।

চিঠি এবং অভিযোগের এক কপি সমকালের হাতে এসেছে। তাতে দেখা যায়, গত ৩ জুলাই অধিভুক্ত পটুয়াখালীর গাজী মুনিবুর রহমান নার্সিং কলেজের পরিচালক জাকির হোসেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর লেখা এক চিঠিতে লেখেন- ‘২৭ জুন মো. তৈয়ব আলী গাজী মুনিবুর রহমান নার্সিং কলেজে বিশেষ প্রত্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আসেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তিনি কলেজের অ্যাকাউন্ট অফিসারের কাছ থেকে যাতায়াত ও খাওয়ার খরচ বাবদ আট হাজার টাকা দাবি করেন। পরে তিনি সেই টাকা গ্রহণ করেন। এর আগেও তিনি কয়েকবার আমার নার্সিং কলেজে বিশেষ প্রত্যবেক্ষক হিসেবে আসেন এবং প্রতিবারই যাতায়াত ও খাওয়া খরচ বাবদ অনৈতিকভাবে টাকা নিয়ে যান। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।’ এই চিঠির প্রেক্ষিতে তৈয়বকে ১১ সেপ্টেম্বর কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক।

এ ছাড়াও উপাচার্যকে সুপারিশ করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ফারুক হোসেনকে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন দাবি করে তার কাছ থেকে দামি মোবাইল ফোন কিনতে নগদ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে ক্ষতি করার হুমকি দেন। ফারুকের অভিযোগের প্রেক্ষিতেও তৈয়বকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

গত ৮ সেপ্টেম্বর ৩৪ হাজার গোপনীয় খাম ও ১২ হাজার সভাপতির খাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের ৩১৪ নম্বর কক্ষে আনার খরচেও বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগে মো. তৈয়ব আলীকে শোকজ করা হয়। এক চিঠিতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তৈয়বকে বলেন, ‘ভ্যানভাড়া বাবদ (শ্রমিক খরচসহ) আপনি দুই হাজার টাকার বিল উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু তথ্য নিয়ে জানা গেল যে, এই কাজের জন্য এক হাজার ৩৫০ টাকা খরচ হয়েছে। এমন অবস্থায় অতিরিক্ত ৬৫০ টাকার বিল উপস্থাপন করার বিষয়ে আপনার মতামত লিখিতভাবে এই চিঠি পাওয়ার তিন কার্যদিবসের মধ্যে পেশ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো।’

তৈয়ব আলীর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিরত অবস্থায় পরিচয় গোপন রেখে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা পরিচয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে দুই লাখ টাকা চিকিৎসাভাতা নেন। এছাড়া বাবা-মায়ের অসুস্থতার মানবিক কারণ দেখিয়ে ভাতা পেতে ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি ছাত্রলীগের বদিউজ্জামান সোহাগ ও সিদ্দিকী নাজমুল আলমের কমিটির ধর্মবিষয়ক উপসম্পাদক থাকলেও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের কোনো পদে ছিলেন না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তৈয়ব আলী সমকালকে বলেন, ‘যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তার কোনোটিই সত্য নয়। মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমাকে হয়রানি করা হচ্ছে। এর কারণ হলো- পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের অনেক অনিয়মের কথা আমি জানি, যা প্রকাশ করলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সমস্যা হতে পারে।'

তিনি আরও বলেন, 'সম্প্রতি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহালুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত হচ্ছে বলে জানতে পেরেছি। দুদকে তথ্য যাওয়ার বিষয়ে তিনি আমাকে সন্দেহ করেন। এর প্রতিশোধ নিতেই তিনি আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলছেন।’

এ বিষয়ে জানতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহালুল হক চৌধুরীকে ফোন করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান সমকালকে বলেন, ‘অভিযোগটি পেয়েছি। রেজিস্ট্রারকে বিষয়টি দেখে নোট নিতে বলেছি। নোটটা এলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে অভিযোগের বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটা বড় অংশ একত্রিত হয়েছে। সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।’