প্রোটিন শরীরের অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার নিয়ে সচেতনতার যথেষ্ট অভাব আছে। পোলট্রি মুরগির ডিম ও মাংস পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হলেও সমাজে ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। সুস্থ-সবল জাতি গঠনে প্রাণিজ আমিষের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ব্রয়লার মুরগি নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশের মানুষকে সাশ্রয়ী মূল্যে ডিম, দুধ ও মাংস দিতে হবে এবং প্রোটিনের অধিকার নিশ্চিতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে পোলট্রি শিল্প বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। সরকারের উচিত এ খাতে সহায়তা দেওয়া। গতকাল সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে 'প্রোটিন আমার অধিকার' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা।

বৈঠকের আয়োজন করে সমকাল। সহযোগিতায় ছিল পোলট্রিশিল্পের কেন্দ্রীয় সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এবং ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিল (ইউএসএসইসি)। সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেনের সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মনজুর মোহাম্মদ শাহজাদা। সঞ্চালনা করেন সমকালের অনলাইন বিভাগের বার্তা সম্পাদক গৌতম বি. মণ্ডল। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম। বক্তব্য দেন বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হক, বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের পরিচালক ডা. তাহেরুল ইসলাম খান, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ শাহরিয়ার, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. শেখ মুসলিমা মুন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল হক বেগ, কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাবেক মেম্বার ডাইরেক্টর মনিরুল ইসলাম, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কে বি এম সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ইলিয়াস হোসেন, ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলের বাংলাদেশ প্রধান খবিবুর রহমান, ইউএসএসইসির সাউথ এশিয়া সাব-সাহারার হেড অব মার্কেটিং দিবা ইয়ানুলিস, ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি আবু লুৎফে ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার, ব্র্যাকের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রুহিনা বিনতে এ গনি, ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি মো. আহসানুজ্জামান প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, শুধু পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করলেই হবে না; তা কতটা নিরাপদ, এর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য উৎপাদক, ভোক্তা, সরকার, গণমাধ্যমসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষ মনে করে, দেশি মুরগির তুলনায় ব্রয়লারের ডিম ও মাংস কম পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। আমিষ উৎপাদনের পাশাপাশি এ নিয়ে ভুল ধারণা দূর করতে হবে।
ডা. মনজুর মোহাম্মদ শাহজাদা বলেন, ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে মেধাসম্পন্ন জাতি সৃষ্টির জন্য প্রোটিনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলেন, দেশে গ্রামাঞ্চলে ৫০ শতাংশ মানুষের প্রোটিনের চাহিদা এখনও পূরণ হয়নি। আমাদের সবার প্রতি কিলোগ্রাম দেহের ওজনের জন্য এক গ্রাম পরিমাণ প্রোটিন খাওয়া দরকার।
মসিউর রহমান বলেন, কোন জিনিসটির দাম বাড়েনি? কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এখন উৎপাদন খরচ বেড়েছে।

সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন বলেন, পোলট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাত এ দেশে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। দেশের প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের জন্য প্রাণিজ আমিষের গুরুত্ব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। এ খাতের প্রসার ও প্রোটিনের অধিকার নিশ্চিতে সমকাল সচেষ্ট আছে।
ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হক বলেন, খাবার নিয়ে অনেক ভুল বার্তা ছড়ানো হচ্ছে। ডিম ও দুধের চেয়ে আর কোনো খাবারে এত প্রোটিন নেই। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার দরকার।

দিবা ইয়ানুলিস বলেন, খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে ভোক্তাদের এমনভাবে সমন্বয় ঘটাতে হবে, যেন নিরাপদ ও মানসম্পন্ন খাদ্য সবার জন্য সুলভ করা যায়।

আবু লুৎফে ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ফিডের দাম বেড়েছে। আমরা যখন লোকসান দিই, তখন কেউ কথা বলে না। কিন্তু যখন দাম বাড়ে, তখন আমাদের দোষ দেওয়া হয়। উৎপাদন খরচ কমলেই বাড়বে উৎপাদন, কমবে দাম। তাহলে সবার প্রোটিনের অধিকার নিশ্চিত হবে।
আহসানুজ্জামান বলেন, আমরা এখন লোকসান দিয়ে ব্যবসা করছি। ডিমের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে একটি গোষ্ঠী বলছে- একশ্রেণির ব্যবসায়ী নাকি হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে। মিডিয়াও এটি ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে, যা পুরোপুরি মিথ্যা। এখানে কোনো সিন্ডিকেট হয়নি, উল্টো আমরা খুবই কষ্টে আছি।
অধ্যাপক ইলিয়াস হোসেন বলেন, ডিম খেলে আমাদের মেধাবী জাতি গঠন হবে। অথচ দীর্ঘদিন বলার পরও স্কুল ফিডিংয়ে বাচ্চাদের জন্য ডিম দেওয়া হচ্ছে না।

অধ্যাপক কে বি এম সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের মানসিকতার মধ্যে আছে লেয়ার মুরগি, ফার্মের দুধ-ডিম ভালো না। এ ভ্রান্ত ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
ড. আনোয়ারুল হক বেগ বলেন, পৃথিবীতে কে নোবেল পুরস্কার পায়? নোবেল পুরস্কার পায় তারা, যারা দুধ ও ডিম বেশি খায়। এ কারণে আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে এই পুরস্কার বেশি পাচ্ছে।

মনিরুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় আর্থিক সমস্যার কারণে মানুষ প্রোটিন খেতে পারে না। তবে অনেক সময় প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারকে অনিরাপদ বলে অপপ্রচার চালানো হয়। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।


বিষয় : গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা প্রোটিনের অধিকার নিশ্চিত

মন্তব্য করুন