বঙ্গবন্ধুর বীরকন্যা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, বাঙালির আশার বাতিঘর, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৬তম জন্মদিন আজ। ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ঘর আলোকিত করেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুভ শুভ শুভ দিন, আজ বঙ্গবন্ধুর বীরকন্যার জন্মদিন, বাঙালির আশার বাতিঘরের শুভ জন্মদিন। শুভ জন্মদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি শতায়ু হোন। দেশের জন্য আপনাকে প্রয়োজন। '৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে আমরা হারিয়েছি। সেই হারানোর অপূর্ণতা এই দেশ এই জাতি কখনও পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে ১৭ কোটি বাঙালির অভিভাবক হিসেবে আপনাকে সামনে রেখেই আমরা পথ চলছি সফলতার সঙ্গে।

রূপকথাকেও হার মানায় বঙ্গবন্ধুকন্যার জীবনগাথা। গল্পের দুঃখিনী রাজকন্যার দুঃখকষ্ট, রোমাঞ্চকর নানা ঘটনাও যেন ম্লান তাঁর জীবনকাহিনির কাছে। তাঁর মা-বাবা, ভাইসহ নিকটাত্মীয়দের একই দিনে হত্যা করা হয়। নিজেও হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছেন ২১ বার। খুব কাছ থেকে প্রিয় সহকর্মীদের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখেছেন। অবৈধ শাসকের বিরোধিতা করতে গিয়ে বন্দিজীবন কাটিয়েছেন। পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার এক নিভৃত পল্লি থেকে উঠে এসে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করেছিলেন পরাধীনতা থেকে, বাঙালিকে এনে দিয়েছিলেন একটি স্বাধীন দেশ। অথচ পিতার মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় সেই দেশে তিনি ফিরতে পারেননি। তাঁকে প্রতিবেশী একটি দেশে আশ্রিত জীবনযাপন করতে হয়েছে। এমন অসংখ্য ঘটনার অভিজ্ঞতায় পূর্ণ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫ বছরের জীবন। তবে এসব কোনো কিছুই তাঁর পথচলাকে রুদ্ধ করতে পারেনি। দেশকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন দৃঢ়তার সঙ্গে।
বাংলার মানুষের কাছে যাঁর রয়েছে বহু পরিচয়, বিশ্বের মানুষ তাঁকে চেনেন বহু উপাধি ও উপনামে। কখনও তিনি জোয়ান অব আর্ক, কখনও তিনি মাদার অব হিউম্যানিটি। আবার কখনও তিনি প্রাচ্যের নতুন তারকা। বিশ্ব সংস্থায় আবার তিনি পরিচিত শান্তি বৃক্ষ (পিস ট্রি) নতুবা চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ। কিন্তু এসব উপাধিকে ছাড়িয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর হাচু বা হাচিনা আর বাঙালির হৃদয়ে তিনি প্রোথিত হয়ে আছেন 'শ্যাখের বেটি হাচিনা' (শেখের বেটি হাসিনা) হয়ে, যা আর সব উপাধিকে নিঃসন্দেহে নিষ্প্রভ করে দিয়েছে। কিন্তু এই শেখের বেটির গল্পটি রচিত হয়েছে মাত্র কয়েক দশকে। কণ্টকাকীর্ণ এই রাজনৈতিক ময়দানে তাঁর আবির্ভাবের কথা আমরা তাঁর মুখ থেকেই শুনতে পাই। 'আমার ৭২ বছর জীবনের ৬০ বছরই কেটেছে রাজনীতিতে। স্কুল থেকে রাজনীতি শুরু করেছি, এখনও অব্যাহত। রাজনীতিতে কে কী করেছে অনেক ঘটনা নিজ চোখে দেখেছি।'
জাতির পিতাকে হত্যার পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা। এর আগেই ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে দলের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। জাতির পিতাকে হারিয়ে তখন ধুঁকছে আওয়ামী লীগ। দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। বিধ্বস্ত এ দলটিকে পুনর্গঠন করা তরুণ শেখ হাসিনার জন্য সহজ কাজ ছিল না। একদিকে সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াই, অন্যদিকে দলকে সংগঠিত করা। ফলে দলে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাও ছিলও তাঁর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এসব কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো একযোগে মোকাবিলা করতে হয়েছে শেখ হাসিনাকে। তিনি বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্যের সঙ্গে একে একে সব বাধাই ডিঙিয়ে গেছেন। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। পিতার রাজনীতি তাঁর অস্থিমজ্জায়। তাঁর বাবার রাজনৈতিক উত্থান নিজের চোখে তিনি দেখেছেন। কীভাবে বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনীতির গগণ পথে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন, আত্মবিশ্বাস নিয়ে কীভাবে সবাইকে পেছনে ফেলে একদল বিশ্বস্ত সহযোগীদের নিয়ে এগিয়ে গিয়েছে এগুলো দেখে-শিখেই বেড়ে উঠেছেন শেখ হাসিনা। আর ছাত্রলীগের কর্মী থেকে রাজনীতির পাঠ গ্রহণ, স্কুল-কলেজে পড়ার সময় থেকেই নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতাও তখন সবার দৃষ্টি কাড়েন এবং বিশ্বস্ত-গ্রহণযোগ্য হয়ে ১৯৬৬ সালে বেগম বদরুন্নেছা কলেজ ছাত্রী সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে ভিপি (সহসভাপতি) নির্বাচিতও হন।
মানববতার মা শেখ হাসিনার পেছনে ফেলে আসা ৭৫ বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় তিনি প্রতিকূল স্রোতে নৌকা বেয়ে চলেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা 'গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা', বলিষ্ঠ একজন সমাজ সংস্কারক। গত বছর ইউনেস্কোর সাবেক প্রধান ইরিনা বোকোভা বলছিলেন, 'সাহসী নারী' হাসিনা সবাইকে পথ দেখাচ্ছেন। আসলেই তিনি সবাইকে পথ দেখাচ্ছে। বিশ্বে চারবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তিনি সততা, মেধা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতায় তিনি বিশ্বসেরা প্রধানমন্ত্রী।
ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগানকে সামনে রেখে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের পর শেখ হাসিনার দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়েই মূলত উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণের এক অবিশ্বাস্য যাত্রা শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেন শেখ হাসিনা। তিনি ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের আগেই দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। তাই ডেলটা প্ল্যান ২১০০ ঘোষণা করেছেন। ইতোমধ্যে প্রকল্প এগিয়ে কাজও শুরু করেছেন। এই জাতির পিতার ক্ষুধা দারিদ্র্য মুক্ত একটি সুখী সমাজ গঠনের লক্ষ্য পূরণের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। এ উন্নয়ন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। এখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা।
আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্বে থাকা শেখ হাসিনা ৩৮ বছর ধরে নিজ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আপসহীন নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশের রাজনীতির মূল স্রোতধারার প্রধান নেতা হিসেবে তিনি নিজেকে শুধু উপমহাদেশেই নয়, বিশ্ব নেতৃবৃন্দের নজর কাড়েন।
শেখ হাসিনা আমাদের শিখিয়েছেন, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে মাথা উঁচু করে কীভাবে পশ্চিমাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সঠিক বিচারের মাধ্যমে মানবতাবিরোধীদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলাতে হয়। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি কতটুকু দায়িত্ববান হলে নিজ দলের কোনো নেতাকর্মী অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও আপসহীনভাবে কীভাবে আইনের আওতায় আনতে হয় এটি একমাত্র শেখ হাসিনাই আমাদের সামনে উদাহরণ। পাকিস্তানের জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে, বারবার মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালে অধিকারবঞ্চিত বাঙালিদের যেভাবে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ঠিক তেমনিভাবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের যেখানেই মানুষ তার অধিকারবঞ্চিত হবে, যেখানেই শোষণ আর নির্যাতনের শিকার হবে, নিষ্পেষিত হবে মানুষ আর মানবতা; সেখানেই ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এই শুভ কামনায় শুভ জন্মদিন।
একটি কাঙ্খিত স্বপ্ন নিয়ে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরাধিনতার শৃঙ্খল ভেঙে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তা পুরণ হয়েছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ধাক্কা ছিল। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা ফিরে না এলে ইতিহাসের স্বপ্ন ভঙ্গ হতো। সেই আকাঙ্ক্ষার পরিণত যিনি জাতির পিতাতে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা ফিরে না এলে ৩০ লাখ শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতো না। ইতিহাসের নৈবেদ্য সাজানো, সেটা হচ্ছে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন। সেটা বাস্তবায়ন হতো না। তাঁকে ঘিরে এগিয়ে যেতে হবে।
পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো বাংলাদেশ ও বাঙালিদের কল্যাণ কামনা করেন। জনগণের মঙ্গল কামনায় সব সময় তিনি নিয়োজিত থাকেন। যার সর্বশেষ প্রমাণ মেলে ভারত সফরে আজমির শরিফ দরগাহে গিয়ে দেশের জনগণের জন্য দোয়া চেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন একজন রাজনীতিক, যিনি মহাকাশে স্যালেটাই পাঠান, আবার নিভৃত পল্লিতে একজন বিধবা নারী, স্বামী পরিত্যক্ত, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভাতা পেলেন কিনা? কোনো ভূমিহীন ঘর পেলেন কিনা সেটারও খোঁজখবর রাখেন। তিনি ভবিষ্য প্রজন্মের জন্য কাজ করেন।
আসুন শেখ হাসিনাকে আলোকবর্তিকা ধরে নিয়ে জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করি। ইতিহাসের নেতৃত্ব যে সাজানো বাংলাদেশ শেখ হাসিনার হাত ধরে। শেখ হাসিনাকে আলোকবর্তিকা ধরে নিয়ে অন্ধকার অমানিশাকে পাড়ি দিই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অপ্রতিরোধ যাত্রায় দুর্গম কর্ককান্তি পথে তাঁকে ঘিরেই এগিয়ে যাব- এটাই হোক আজকের প্রত্যাশা।
শুভ জন্মদিন বঙ্গবন্ধুর বীরকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আল্লাহ আপনার দীর্ঘায়ু দান করুন- আমিন।
এনামুল হক শামীম এমপি: উপমন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, সাবেক ভিপি, জাকসু