সংবাদপত্রবিষয়ক পঠন-পাঠনে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জনক থমাস জেফারসনের উক্তিটি ঘুরে-ফিরে আসে, যেটা এমন- 'আমাকে সংবাদপত্রবিহীন সরকার অথবা সরকারবিহীন সংবাদপত্রের একটিকে বেছে নিতে বলা হলে আমি নির্দি্বধায় দ্বিতীয়টি বেছে নেব।' শব্দার্থে বাস্তবোচিত মনে না হলেও, প্রতীকী অর্থে ধরে নিলেও, এই উক্তির মধ্যে রাষ্ট্রনায়ক আধুনিক সমাজে সংবাদপত্রের গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও শক্তিকে নির্দেশ করেছেন। এবং তা সন্দেহাতীত।

জনগণকে প্রাত্যহিক খবরাখবর জানানোর বাহন সংবাদপত্রকে হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য। অর্থাৎ সঠিক খবর দিতে হবে। এর ব্যত্যয় তথা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সমস্যাটিও সংবাদপত্রের শুরু থেকেই রয়েছে। জনগণ অভিজ্ঞতা থেকেই জেনেছে, খবরের কাগজে যা-কিছু ছাপা হয় সব বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবু খবরের কাগজ ছাড়া মানুষের চলেই না। বিশ্বাসযোগ্যতার হেরফেরে কোনো সংবাদপত্র মানুষের কাছে আদরণীয়, কোনোটি তারা আড়চোখে দেখে। এই সমস্যাটিকে কটাক্ষ করে মার্কিন রসরাজ সাহিত্যিক মার্ক টোয়াইন বলেছিলেন, 'যারা খবরের কাগজ পড়ে না তারা খবর জানতে পারে না। আর যারা খবরের কাগজ পড়ে তারা ভুয়া খবর জানতে পারে।'

খবর বা খবর হওয়ার আগে যা শুধু তথ্য থাকে সেইটি সংগ্রহ, খবর লেখা, সম্পাদনা ও পরিবেশন, খবরের রীতিনীতি, তথ্যের উৎস, তথ্য যাচাই ও প্রামাণ্য করা, খবর বস্তুনিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া ইত্যাদি, ইত্যাদি এবং ইত্যাদি নিয়ে শতাধিক বছরে বিশাল বিদ্যাভান্ডার গড়ে উঠেছে। গণযোগাযোগ তত্ত্ব ও সাংবাদিকতা বিষয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে জাবদা জাবদা বই পড়ানো হয়, পরীক্ষায় পাস দিতে হয়। দেশে-বিদেশে বহু প্রতিষ্ঠানে নানা মাত্রার প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। এ-সবের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা একটি জ্ঞাননির্ভর সুশৃঙ্খল পেশা। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা পড়েই সাংবাদিক হতে হবে তা নয়। এটি এমন একটি উন্মুক্ত পেশাও বটে যে, সাধারণ অক্ষরজ্ঞান ও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন যে-কোনো মানুষ সাংবাদিকতার কলাকৌশল বুঝে নিয়ে ও নীতি-নৈতিকতা মেনে সাংবাদিক হতে পারেন। আর দুনিয়ার সবকিছুরই উচ্চমান, নিম্নমান, বিশুদ্ধতা ও ভেজাল রয়েছে। গুণের কদরও সব সময় রয়েছে।

এতকিছু জ্ঞান-সাধনা-অনুশীলনের পরে, আধুনিক যুগে দু শ' বছরের পথ পেরিয়ে বর্তমান আধুনিকোত্তর সময়ে সাংবাদিকতা আবার এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। এতে অপার সম্ভাবনা ও দুরূহ চ্যালেঞ্জ দুটোই। ইন্টারনেট ব্যবহার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির ফলে একদিকে তথ্য সংরক্ষণ ও অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে খবর একই সঙ্গে অগণিত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিপুল বিরাট সুযোগ, অপরদিকে একই গতিতে সাংবাদিক ছাড়াও অনেক মানুষের দ্বারা যাচাই-বাছাইহীন ভুয়া খবর, ফেক নিউজ, গুজব, উদ্দেশ্যমূলক প্রচার-অপপ্রচার ছড়িয়ে দেওয়ার তাণ্ডব। যাঁর হাতে একটি স্মার্টফোন আছে তিনিই জানতে পারছেন এ দুইয়ের মাজেজা। ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে মানুষ খবর ও গুজব দুই-ই পাচ্ছে। এখন তাই আবার নতুন মাধ্যমে সেই মৌলিক কাজ তথা সঠিকভাবে যাচাই, অনুসন্ধান ও সম্পাদনা, সুসাংবাদিকতা নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে।

ছাপানো কাগজের পাশাপাশি রেডিও-টেলিভিশন, যাকে ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা বৈদ্যুতিন মাধ্যম বলছি তা অনেক আগেই এসেছে। এখন এলো অনলাইন, ডিজিটাল মিডিয়া, নিউ মিডিয়া, মাল্টিমিডিয়া। এভাবে নামের পরিবর্তন প্রযুক্তির অতিদ্রুত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের কারণে। সংবাদপত্র আর নয়, সংবাদমাধ্যম। দিনের জন্য সকালবেলার সংবাদপত্র নয় শুধু, ২৪ ঘণ্টাই বিরামহীন খবর প্রচার। শুধু ছাপানো কাগজ এখন নেই বললেই চলে। প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রই এখন ইন্টারনেটে গিয়ে একাধারে পড়া যায় (টেক্সট), শোনা যায় (অডিও) ও দেখা (ভিডিও) যায়। তবে ইন্টারনেটে যেহেতু ভুয়া খবর ও গুজবের দৌরাত্ম্য আছে এবং যখন-তখন তা মুছে পরিবর্তিত করা যায় তাই ছাপানো কাগজই সর্বাধিক প্রামাণ্য, স্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য বলে এর গ্রহণযোগ্যতা থাকবে। ছাপানো কাগজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যে বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞের বড় অংশ তা-ই বলছেন। তবে মুদ্রিত সংবাদপত্রের ক্রেতা ও বিজ্ঞাপন আয় অনেক কমে যাওয়া এখনকার একটি সংকট।

এমন এক টালমাটালকালে আজ থেকে ১৭ বছর আগে দৈনিক সমকাল-এর আত্মপ্রকাশ। সমকাল আঠারোয় পা দিল। সংবাদপত্রকে গুণে-মানে জন্মের প্রথম দিন থেকেই সাবালক হতে হয়। তবু আমাদের স্মরণ করতে ভালো লাগবে অকালপ্রয়াত কবিকিশোর সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের অনুপম কবিতাখানি, "আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ / স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি, / আঠারো বছর বয়সেই অহরহ / বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।..."

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম গণমানুষের স্বার্থে ঐতিহাসিক বীরোচিত ভূমিকা পালন করেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত, আগে-পরে স্বৈরশাসনবিরোধী সকল গণতান্ত্রিক গণসংগ্রামে মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রম বাদে মূলধারার সকল সংবাদমাধ্যম জনগণের পক্ষে থেকেছে সংবাদ পরিবেশনে, মন্তব্যে-বিশ্নেষণে, জনমত গঠনে। গত ১৭ বছরে সমকালও অর্জন করেছে মূল্যবান অভিজ্ঞতা। রাজনৈতিক দিক থেকে পরস্পরবিরোধী মতাদর্শের দলের শাসনকাল, সামরিক বাহিনী সমর্থিত বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্তর্বর্তী শাসনে তথা সব সময় অবিচলভাবে যথাসাধ্য বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করে আমরা পাঠকের ভালোবাসা ও আস্থা অর্জনে সচেষ্ট থেকেছি। রাজনীতি, অর্থনীতি, উন্নয়ন, ক্রীড়া, দুর্নীতি, অপরাধ প্রভৃতির সকল প্রয়োজনীয় সংবাদ, সম্পাদকীয় মতামত, সাহিত্য, জীবনশৈলীসহ নানা স্বাদের ফিচার, অনলাইন, ডিজিটাল প্ল্যাটাফরমগুলো শক্ত ও সম্প্রসারিত করা প্রভৃতি সকল কর্মযজ্ঞে পেশাদারিভাবে আমরা পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী সক্রিয়।

আমরা পুনরুক্তি করতে চাই, সম্পাদকীয় নীতিতে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা, সর্বজনীন মানবাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন-মর্যাদাসহ সমানাধিকার, শোষণ-বৈষম্যের বিপরীতে সামাজিক সমতা, বিশ্বশান্তি প্রভৃতি প্রগতিশীল আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন, অবিচল। স্পষ্টীকরণের জন্য বলি, দলীয় বৃত্তের সম্পূর্ণ বাইরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চর্চিত এইসব আদর্শের পক্ষে আমরা। কোনো দল-গোষ্ঠীর পক্ষে নই। সংবাদ পরিবেশনে সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠতা আমাদের অঙ্গীকার।

পাকিস্তান আমল থেকে এবং বাংলাদেশেও সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য, একাধিক নিবর্তনমূলক আইনের বিরুদ্ধে সাংবাদিক ও জনগণকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে। সরকারের বাইরের কায়েমি স্বার্থবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সংসদীয় গণতন্ত্র চালু থাকলেও স্বাধীনতা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেমন, এখনও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যুক্তিসংগত সংশোধনের জন্য সাংবাদিকদের প্রবল প্রচেষ্টা চালাতে হচ্ছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, চরিত্রগতভাবেই সংবাদমাধ্যম এমন প্রতিষ্ঠান যে ক্ষমতাধর ও কায়েমি স্বার্থের মুখোমুখি তাকে হতেই হয়। সব দেশে তা কম-বেশি সত্য। সমকালের কাছেও ব্যক্তি, নাগরিক ও সামাজিক পর্যায়ে মানুষের মৌলিক অধিকারই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বিবেচ্য।

আমাদের ১৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী গত ৩১ মে অতিক্রান্ত হয়েছে। করোনা মহামারি ও দুই ঈদের মধ্যবর্তী সময় হওয়ায় আমরা তখন আকাঙ্ক্ষামতো উদযাপন করতে পারিনি। মহামারিতে গত দুই বছর উদযাপন ছিল সীমিত। এ সময়ে কভিডে আক্রান্ত অনেক মানুষের মধ্যে দেশের কয়েকজন বরেণ্য ব্যক্তি, সম্পাদক, সাংবাদিক, কলামিস্টকে আমরা চিরতরে হারিয়েছি। তাঁদের স্মৃতি আমরা আবার শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করে আজ বৃহস্পতিবার, শনিবার ও সোমবার প্রতিটি ৫২ পৃষ্ঠা করে তিন দিন বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে। প্রতিবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একটি করে সময়োপযোগী স্লোগান আমরা নির্বাচন করি। এবার রয়েছে 'যুক্তি, মুক্তচিন্তা, আগামী'। রাজনীতিতে, সমাজে বহুলাংশে যুক্তির অন্তর্ধান, পশ্চাদপদতা, ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডূকতা, চিন্তার আড়ষ্ঠতা, মুক্তচিন্তায় বাধার বিরুদ্ধে সচেতনতা, লড়াই এবং দেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টা, শিক্ষা, তারুণ্যের বোঝাপড়া ও অগ্রগামিতায় দেশের ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে বিশিষ্ট চিন্তক, লেখকদের রচনায় বিশেষ সংখ্যাগুলো সাজানো হয়েছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আমাদের পাঠক, গ্রাহক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানাই। ছাপানো কাগজ কিনে পড়ূন। অনলাইন সংস্করণ আপাতত নিখরচায় পড়ূন। বিদ্রোহী কবির 'অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস' এই বাণী নিয়ে প্রথম থেকে আমাদের পথচলা, সে অঙ্গীকার আঠারো বছর বয়সে আরও শাণিত করার সময়। আমাদের সঙ্গে থাকুন।
-মোজাম্মেল হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সমকাল