সমুদ্র উপকূলীয় উপজেলা কক্সবাজারের মহেশখালী। এখানকার দারিদ্র্যপীড়িত একটি গ্রাম মুদিরছড়া। ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মুদিরছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সালমা আক্তার। বাবা নদীতে মাছ শিকার ও কৃষিকাজ করেন। মা ঘরের কাজের পাশাপাশি দুটি দুগ্ধজাত গবাদি পশু লালন-পালন করেন। সামান্য আয়েই চলে পাঁচ সদস্যের সংসার। সম্প্রতি তাদের বাড়িতে গেলে চোখে পড়ে উঠানে বসে ভাত খাচ্ছে সালমা। খাবার বলতে শুধু মরিচ ভর্তা ও ডাল। জিজ্ঞেস করতেই সে জানাল, প্রায় প্রতিদিনই এ রকম খাবারই খায় তারা। অভাবের তাড়নায় দৈনিক দুই থেকে আড়াই কেজি দুধ গ্রামের চা দোকানে বিক্রি করে দেন তার বাবা। কবে গরুর দুধ খেয়েছে, তা মনে করতে পারে না ছোট্ট সালমা।

শুধু সালমা নয়, তার স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই একই অবস্থা। দরিদ্রতা ছাড়াও দুধ খাওয়া নিয়ে আছে অসচেতনতা। এমন চিত্র দেশের অধিকাংশ গ্রামের। অবশেষে পুষ্টিবিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে এবং অপুষ্টির হাত থেকে শিশুদের রক্ষায় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) আওতায় দেশের ৬১ জেলার ৩০০ উপজেলার ৩০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ২০০ মিলিলিটার করে দুধ খাওয়ানো হবে। এ পাইলট প্রকল্পটি সফল হলে দেশের সব স্কুল ও শিশুকে এমন কর্মসূচির আওতায় আনা যাবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার কিছু দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুলের শিশুদের গুঁড়া দুধ দেওয়া শুরু করে। ১৯৯৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে খাদ্য কর্মসূচি চালু হয়। এ কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের চাল, ডাল ও নগদ অর্থ দেওয়া হতো। ২০০০ সালের পর থেকে এসবের বদলে ভিটামিনসমৃদ্ধ বিস্কুট দেওয়া হয়। ২০০২ সালে যশোরে বন্যাকবলিত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি সাহায্য হিসেবে বড় পরিসরে স্কুলে খাওয়ানো কর্মসূচি চালু হয়। ২০১০ সালে ডব্লিউএফপির সহায়তায় কর্মসূচিটি জাতীয় পর্যায়ে শুরু হয়ে চলে ২০১৪ সাল পর্যন্ত। ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হয়। তবে গত ১ জুলাই বন্ধ হয়ে যায় এ কার্যক্রম। অবশেষে এলডিডিপি প্রকল্পের আওতায় চালু হচ্ছে স্কুল মিল্ক্ক ফিডিং কার্যক্রম।

আগামী জানুয়ারি থেকে এ কার্যক্রম শুরুর আশা করে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক ডা. হিরণ্ময় বিশ্বাস সমকালকে জানান, প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্পের এক বছর প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২০০ শিক্ষার্থীকে ১৬০ দিন দুধ খাওয়ানো হবে। যারা দুধ খায় এবং যারা খায় না তাদের মধ্যে পার্থক্য দেখানো হবে। দুর্গম এলাকা ও দরিদ্র মানুষকেই এখানে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ের জন্য উপজেলা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, দুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি শিশুদের উচ্চতা, ওজনসহ শারীরিক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।

এলডিডিপি প্রকল্পের চিফ টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর ড. গোলাম রব্বানী বলেন, গরুর দুধ আদর্শ পুষ্টিকর খাবার। তাই দুধের প্রতি শিশুদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি নিয়মিত দুধ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে স্কুল মিল্ক্ক ফিডিং শুরু হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলেন, বর্তমানে গ্রামাঞ্চলেও শিশুরা দুধের বদলে বাজারের বিভিন্ন ক্ষতিকর সফট ড্রিংকসের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বিকল্প হিসেবে দুধ উদ্বুদ্ধ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে কোমলমতি শিশুরা।