স্বচ্ছ নীলাকাশ। সকালের মিষ্টি রোদ, কাশফুল ঘেরা সজ্জা শান্তশিষ্ট এক স্নিগ্ধতা। কোলাহলপূর্ণ ব্যস্ত নগরীর তখনও ঘুম ভাঙেনি। প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গে চিরচেনা শরতের আবহে যেন চারদিক মাতোয়ারা।  শুক্রবার সাতসকালে এমন চিত্রের দেখা মেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলার বকুলতলায়।

করোনা মহামারির রিক্ততা কাটিয়ে দুই বছর পর এখানে উন্মুক্ত আবহে প্রকৃতি বন্দনায় নাচে-গানে, আবৃত্তিতে শরৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে ছায়ানটের শিল্পীদের নৈপুণ্যে। তরুণদের শুভ্র পাঞ্জাবি আর তরুণীদের জলছাপের রংধনু রঙের শাড়ির সঙ্গে নানা সাজে প্রকৃতিতে ঘটে অপরূপ প্রাণসঞ্চার। শিল্পী, সংগীত অনুরাগী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মিলনমেলায় পরিণত হয় বকুলতলা।

এনামুল হক ওমর ও মৃত্যুঞ্জয় মজুমদারের ঢোল, অসিত বিশ্বাসের এসরাজ এবং প্রদীপ রায়ের মন্দিরায় জীবন্ত হয়ে শিল্পীদের কণ্ঠের 'ওগো শেফালি বনের মনের কামনা' ধরা দেয়।

উৎসবে একক গান পর্বে দীপ্র নিশান্ত শোনান, 'শরৎ-আলোর কমলবনে/ বাহির হয়ে বিহার করে যে ছিল মোর মনে মনে'। 'আমার রাত পোহালো শারদ প্রাতে' শোনান নাঈমা ইসলাম নাজ। অসীম দত্তের ভরাট কণ্ঠে 'তুমি ঊষার সোনার বিন্দু', অভয়া দত্ত গেয়ে ওঠেন, 'তোমার সোনার থালায় সাজাবো আজ'। এটিএম জাহাঙ্গীর 'আমি চাহিতে এসেছি শুধু একখানি', সেমন্তি মঞ্জরি 'আজি মেঘ কেটে গেছে', তাহমিদ ওয়াসিফ ঋভু 'কেন যে মন ভোলে আমার', সুতপা সাহা 'কার বাঁশি নিশি ভোরে', সেঁজুতি বড়ূয়া 'আমার নয়ন ভুলানো এলে' এবং মাকসুরা আখতার গেয়ে শোনান, 'হৃদয়ে ছিলে জেগে'।

কবিগুরু উচ্চারিত হন আরও বিভিন্ন আঙ্গিকে। তাঁর 'বিচিত্র' প্রবন্ধ থেকে অংশবিশেষ পাঠ করেন সাংবাদিক জাহীদ রেজা নূর। ছায়ানটের শিল্পী সুমনা বিশ্বাস আবৃত্তি করেন কবিগুরুর কবিতা 'শরৎ'। এ ছাড়া মহুয়া মঞ্জরী সুনন্দার গাওয়া গান 'তোমরা যা বল তাই বল'- এর সঙ্গে একক নৃত্য পরিবেশন করেন সুদেষ্ণা স্বয়ংপ্রভা তাথৈ।

ছায়ানটের খুদে শিল্পীদের দল পরিবেশন করে 'শরতে আজ কোন অতিথি', 'আজ ধান ক্ষেতের রৌদ্র ছায়ায়' ও 'মেঘের কোলে রোদ হেসেছে' গানগুলো। সঙ্গে পরিবেশিত হয় নৃত্য।

সম্মেলক গানের পরিবেশনায় 'আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ' ও 'তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে' পরিবেশন করে ছায়ানটের বড়দের দল। জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের একটি দল নাচ করে 'দেখো দেখো শুকতারা আঁখি মেলে চায়' গানের সঙ্গে। জাতীয় সংগীতে দেড় ঘণ্টার উৎসবে নামে সমাপ্তি।

ছায়ানটের শারদ উৎসবে রোমাঞ্চকর উপস্থিতি ছিল দর্শনার্থীদের। ছুটির দিনে ভোরে উপস্থিত হন হাজারো সংস্কৃতিপ্রেমী। বাবার সঙ্গে উৎসবে এসেছিল শিশু বুলবুল। অনুভূতি প্রকাশে সে জানায়, অনেক দিন পর ছায়ানটের অনুষ্ঠান হচ্ছে জেনেই বাবার সঙ্গে এসেছি। বন্ধুরাও এসেছে, খুব ভালো লেগেছে।

ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা বলেন, প্রতিবছর আমরা পহেলা বৈশাখ, বর্ষামঙ্গল ও শরতের অনুষ্ঠান করি। করোনার কারণে তাতে ছেদ পড়েছিল। দীর্ঘদিন পরে ফিরলেও আজকে এই অনুষ্ঠানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ধর্ম যাই হোক, সবাই আমরা প্রকৃতির সন্তান। সবার সঙ্গে মিলে চলার যে ব্যাপার, এসব বিষয় আমরা তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।