দেশের মানুষকে করোনা মহামারি থেকে সুরক্ষা দিতে টিকা কেনা ও ব্যবস্থাপনায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করেছে সরকার। এই ব্যয়ে লাগাম টানতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করোনাসহ অন্যান্য রোগের টিকা উৎপাদনে বিশেষ নজর দিচ্ছে সরকার। এ জন্য টিকা তৈরির প্রশিক্ষণ নিতে মাইক্রোবায়োলজিস্ট, ফার্মাসিস্টসহ ১০ বিশেষজ্ঞকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠানো হয়েছে। তিন মাসে টিকা তৈরির সার্বিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এর মধ্যে ৫ কর্মকর্তা দেশে ফিরে টিকা উৎপাদনে কাজ শুরু করেছেন।

সরকার নিয়ন্ত্রিত এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, প্রশিক্ষণ শেষে এসব কর্মকর্তা গোপালগঞ্জে ইডিসিএলের টিকা কারখানায় কাজ করবেন। টিকা কারখানার জন্য গোপালগঞ্জে এরই মধ্যে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় টিকা তৈরিতে গতি আনতে এবং দ্রুত সময়ে টিকা উৎপাদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে দফায় দফায় বৈঠক শেষে ইডিসিএল, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেশীয় জনবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে টিকা তৈরি শিখতে সারাদেশ থেকে ২০ কর্মকর্তা বাছাই করে তাঁদের জীবনবৃত্তান্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠানো হয়।

তাঁদের মধ্যে প্রথম দফায় ৫ জন মে মাসের শুরু থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ শেষে আগস্টে দেশে ফিরেছেন। দ্বিতীয় দফায় আরও ৫ জন কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছে। আরও দুই ধাপে বাকিদের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হবে। শর্ত হচ্ছে, তাঁদের গোপালগঞ্জে টিকা কারখানায় অন্তত ১০ বছর কাজ করতে হবে।
ইডিসিএল সূত্র জানায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রশিক্ষণ চলছে। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরা কর্মকর্তারা সেপ্টেম্বরেই টিকা উৎপাদনের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছেন।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা মোজাহেরুল হক সমকালকে বলেন, টিকা উৎপাদনে বিভিন্ন দেশ এক ধরনের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে। তিনি জানান, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা ২০০৭ সালেই জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটকে আধুনিক কারখানা তৈরির পরামর্শ দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই পরামর্শ কাগজে-কলমে রয়ে গেছে। সেই সময় কাজটি এগিয়ে নেওয়া হলে আজ বিদেশের কাছে ধরনা দিতে হতো না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সরকারিভাবেই বিভিন্ন রোগের টিকা উৎপাদনে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। প্রথম পর্যায়ে বিদেশ থেকে বড় পরিমাণ (বাল্ক্ক) টিকা এনে তা ছোট ছোট বোতলে ভরা হবে। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হচ্ছে, বিদেশি টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং প্রয়োজনে মানবদেহে পরীক্ষার (ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল) মাধ্যমে দেশেই টিকা উৎপাদন করা। পুরো কাজ শেষ হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক এহসানুল কবির সমকালকে বলেন, 'এখন পর্যন্ত যেসব টিকা আবিস্কার হয়েছে, তা আমরা দেশেই উৎপাদন করতে চাই। এ লক্ষ্যে তিন পর্যায়ে কাজ চলছে। প্রথম পর্যায়ে জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে টিকা উৎপাদনে অর্থায়নের জন্য এডিবির সঙ্গে আলোচনা চলমান রয়েছে। তৃতীয় ধাপে কিছু জনবলকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাঁরাই মূলত টিকা উৎপাদন করবেন।'

কত দিনের মধ্যে টিকা উৎপাদন সম্ভব- এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক এহসানুল বলেন, টিকা উৎপাদনে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। জমি অধিগ্রহণের পর ল্যাব নির্মাণ শেষ করে মেশিনারি বিদেশ থেকে আনতে হবে। এরপর বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে বোতলজাত করা হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে হবে পুরোপুরি উৎপাদন। পরে টিকা নিয়ে গবেষণা করা হবে। সব মিলিয়ে ৫ বছর সময় প্রয়োজন হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা পালন করছে টিকা। এ জন্যই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টিকা উৎপাদন করতে চায় সরকার। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চলছে। তবে মন্ত্রী বলেন, টিকা তৈরি করার প্রক্রিয়া এত সহজ নয়। এটা অনেক সময় ও অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। টিকা উৎপাদনের ফর্মুলা অন্য দেশ দিতে চায় না। এটা পাওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সব বিষয় মাথায় রেখেই সরকার কাজ করছে।

গত বছরের এপ্রিলে টিকার ফর্মুলা গোপন রাখার শর্তে সরকার রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে। তবে এ নিয়ে এখনও কোনো অগ্রগতি নেই। এ ছাড়া চীনের সিনোফার্মের কভিড টিকা দেশে উৎপাদনের জন্য গত বছর আগস্টে একটি চুক্তি হয়। এই টিকা দ্রুত সময়ের মধ্যে উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, 'প্রথমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আমরা অনুপ্রেরণা দিয়েছিলাম। তবে আশা অনুযায়ী তারা কাজ করতে পারেনি। আমরা তাদের আবার দ্রুত সময়ে টিকা উৎপাদন প্রক্রিয়া শেষ করার তাগিদ দেব।'