দীর্ঘ এক যুগে দেশের বিদ্যুৎ খাতের ব্যাপক উন্নতি হলেও কিছু ভুলত্রুটির কারণে এর সুফল পুরোপুরি পাচ্ছে না জনগণ। গত এক যুগে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫ গুণের বেশি বেড়েছে; ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। কিন্তু মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কারণ, বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সঞ্চালন-বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়নি। ফলে প্রায়ই ঘটছে গ্রিড বিপর্যয়। উদ্বৃত্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও অঞ্চলভেদে কমবেশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় বিপর্যয়ের পর তদন্ত কমিটি হয়। কিছু সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সেই সুপারিশের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয় না। ফলে গ্রিড ব্যবস্থার উন্নয়নও মানসম্মত হয় না। কেউ কেউ দাবি করছেন, আমলানির্ভর প্রশাসনের কারণে সঞ্চালন-বিতরণ কোম্পানিগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে না।
তদন্ত হয়, সুপারিশ হয়, বাস্তবায়ন নেই :গত মঙ্গলবার গ্রিড বিপর্যয়ের কারণে দেশের চার বিভাগের ৩২টি জেলা ৪ থেকে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন ছিল। নিদারুণ ভোগান্তিতে পড়েছিল সংশ্নিষ্ট এলাকার মানুষ। ২০০২, ২০০৭, ২০১৪ ও ২০১৭ সালেও এমন গ্রিড বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল দেশ। এ ছাড়া আঞ্চলিক বা কিছু এলাকাজুড়ে গ্রিড সমস্যা ঘটছে অহরহ। বড় বিপর্যয়ের পর এক বা একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিগুলো প্রকৃত কারণ প্রকাশ না করলেও অসংখ্য সুপারিশ পেশ করে।

২০১৪ সালে দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউটের পর এ রকম একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটি প্রায় ৩০টি সুপারিশ দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, জাতীয় গ্রিডকে অভ্যন্তরীণ সংযোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক গ্রিডে ভাগ করা। এমনভাবে করতে হবে, যাতে এক এলাকায় বিপর্যয় হলে অন্য এলাকায় তার প্রভাব না পড়ে, অর্থাৎ ছোট ছোট অঞ্চলভিত্তিক গ্রিড। কিন্তু সেটা হয়নি। বর্তমানে জাতীয় গ্রিড পূর্ব ও পশ্চিম দুই অঞ্চলে বিভক্ত। মঙ্গলবারের বিপর্যয়ে পূর্বাঞ্চলের গ্রিড অচল হয়ে পড়ে। ওই সুপারিশে আধুনিক লোড ডেসপাচ সেন্টার (এনএলডিসি), বিতরণ, সঞ্চালন পর্যায়ে স্ক্যাডা (অটোমেশন) চালু, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আধুনিকায়ন ও ফ্রিকোয়েন্সি ভারসাম্যের জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুপারিশ ছিল। এসব সুপারিশ সেভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এনএলডিসি এখনও ফোনে ফোনে বিদ্যুতের লোড ব্যবস্থাপনা দেখভাল করে। অভিযোগ রয়েছে, এনএলডিসিকে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা কার্যকর হচ্ছে না আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। আজ পর্যন্ত এনএলডিসি পিজিসিবির অধীনে থেকে গেছে। অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র ফ্রি গভর্নিং (এফজি) মুড পদ্ধতির আওতায় আসেনি। ফলে গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ভারসাম্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিতরণ ব্যবস্থাপনা স্ক্যাডা সিস্টেমের আওতায় আসেনি। বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে শুধু ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি ডেসকো স্ক্যাডা সিস্টেম চালু করতে পেরেছে। আর ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ ডিপিডিসি এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

জানতে চাইলে ২০১৪ সালের গ্রিড বিপর্যয়ের তদন্ত কমিটির সদস্য ও পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, মোটাদাগের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে। তাঁরা চেয়েছিলেন, এ ধরনের বিপর্যয় দ্রুত সামলানোর জন্য ব্যাকআপ পাওয়ার স্টেশনের সংখ্যা বাড়ানো। সেটি কার্যকর হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা স্মার্ট হচ্ছে। পুরো সিস্টেম অটোমেশনের আওতায় আনতে আরও সময় লাগবে।

পিজিসিবির ব্যর্থতায় সুফল পাচ্ছে না জনগণ :বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২২ হাজার মেগাওয়াট। সঞ্চালন সক্ষমতা সর্বোচ্চ ১৫-১৬ হাজার মেগাওয়াট। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে সঞ্চালন ব্যবস্থার সক্ষমতা ২০ শতাংশ বেশি হওয়া উচিত। বিতরণ ব্যবস্থা আরও ২০/২৫ শতাংশ বেশি হতে হয়। সঞ্চালন লাইন নির্মাণে পিজিসিবি বারবার পিছিয়ে পড়ছে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয় ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্র এখন পর্যন্ত পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয়নি সঞ্চালন লাইন নির্মিত না হওয়ার কারণে। পূর্ণ সক্ষমতার বিদ্যুৎ নিতে না পারায় গত দুই বছর অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে সরকারকে। গত জুন পর্যন্ত পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

ভারতের আদানি গ্রুপের ঝাড়খন্ড বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি মাসেই এই বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে কয়েক মাস পিছিয়ে যেতে পারে। আগামী বছর রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের প্রথম ইউনিট চালুর কথা। এই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার জন্য নির্মাণাধীন সঞ্চালন লাইনের কাজ আগামী বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দেওয়া হলেও সাড়া দেননি পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) ডিন অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, আমলানির্ভর প্রতিষ্ঠানের কারণে বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারছে না। তারা শুধু বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

কাজ শুরু করেছে তদন্ত কমিটি :মঙ্গলবারের গ্রিড বিপর্যয়ের তদন্ত শুরু করেছে পিজিসিবির গঠিত তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির প্রধান ও পিজিসিবির নির্বাহী পরিচালক (পিঅ্যান্ডডি) ইয়াকুব এলাহী চৌধুরী বলেন, গ্রিড বিপর্যয়ের সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বের করার জন্য তাঁরা কাজ শুরু করেছেন। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর তথ্য চাওয়া হয়েছে। শুক্রবারের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

এদিকে, ছয় সদস্যের ওই কমিটিতে গতকাল বুধবার বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একজন শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।


বিষয় : সুফল মিলছে না বিদ্যুতে

মন্তব্য করুন