বিভিন্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ চার যুবকসহ সাতজনকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন জঙ্গি সংগঠনের নাম জানালো র‌্যাব। 'জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকস্ফীয়া' (পূর্বাঞ্চলীয় হিন্দের জামাতুল আনসার) নামে সংগঠনটি ২০১৯ সালে আত্মপ্রকাশ করে। তাদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে ২০১৭ সালে। বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন থেকে সদস্যদের একত্রিত করে গড়ে তোলা হয় এই সংগঠন। এতে যোগ দিয়ে 'সশস্ত্র জিহাদের' উদ্দেশ্যে কুমিল্লার আট তরুণ একসঙ্গে ঘর ছেড়েছিলেন।

গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তার সোহেলের তত্ত্বাবধানে কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ হওয়া তরুণদের সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতির জন্য প্রশিক্ষণ নিতে পটুয়াখালী ও ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। সশস্ত্র হামলা, বোমা তৈরি, শারীরিক কসরত ও জঙ্গিবাদ বিষয়ে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় পটুয়াখালী ও ভোলার চর এলাকায়। এই প্রশিক্ষণে আরও কেউ সহায়তা করেছেন কিনা তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

গ্রেপ্তার যুবকরা হলেন- হোসাইন আহম্মদ, নেছার উদ্দিন ওরফে উমায়ের, বনি আমিন, মো. সাবিত, ইমতিয়াজ আহমেদ রিফাত, হাসিবুল ইসলাম হাসিব ও রোমান শিকদার। গত বুধবার রাতে র‌্যাব সদরদপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব ১১-এর যৌথ অভিযানে মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে রিফাত ও হাসিব ২৩ আগস্ট কুমিল্লা থেকে এবং রোমান প্রায় এক মাস এবং সাবিত দুই মাস আগে হিজরতের উদ্দেশে ঘর ছাড়েন। তাঁদের কাছ থেকে নব্য জঙ্গি সংগঠনের তিন ধরনের প্রচারপত্র, বিস্ম্ফোরক তৈরির নির্দেশিকা সংবলিত পুস্তিকাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ আট তরুণের মধ্যে শারতাজ ইসলাম নিলয় (২২) গত ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কল্যাণপুরের নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। জঙ্গিবাদের পথ সঠিক নয় এবং নিজেকে ভুল পথে ঠেলে দিয়েছেন উপলব্ধি করতে পেরেই নিলয় পরিবারের কাছে ফিরে আসেন। তাঁকে তাঁর পরিবারের হেফাজতে রেখে নিখোঁজ অপর সাতজনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

'সিদ্ধান্ত ভুল ছিল' :খালাতো ভাইয়ের মাধ্যমে নিলয় জঙ্গি সংগঠনের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন। ২৩ আগস্ট হিজরতের উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়েন তিনি। তাঁকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় মা-বাবা, আত্মীয়স্বজনসহ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা বলা হলে তিনি উপলব্ধি করেন- অন্ধকার পথে যাচ্ছেন। গতকাল কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলন শেষে নিলয় বলেন, 'মা-বাবা, স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন থেকে দূরে থাকার কথা কখনও চিন্তাই করতে পারিনি। এ কারণেই সুযোগ বুঝে পটুয়াখালীর মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে চলে আসি।' জঙ্গিবাদে জড়ানোর বিষয়ে নিলয় বলেন, 'নিঃসন্দেহে অন্ধকার ও ভুল পথ। কেউ যেন ভুল করেও জঙ্গিবাদে না জড়ায়।'
কুমিল্লা থেকে একসঙ্গে আটজন কীভাবে ঘর ছেড়েছিলেন সে বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, ওইদিন সকাল ১০টায় নিলয়সহ পাঁচ তরুণ বাড়ি থেকে বের হয়ে কুমিল্লা টাউন হল এলাকায় যান। পরে সোহেলের নির্দেশে তাঁরা দুই ভাগ হয়ে লাকসাম রেলক্রসিংয়ের কাছে হাউজিং এস্টেট এলাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন। নিলয়, সামি ও নিহাল ভুল করে চলে যান চাঁদপুর শহরে। ভুল বুঝতে পেরে রাতে একটি মসজিদে অবস্থান করেন। গতিবিধি সন্দেহ হওয়ায় পুলিশের জেরার মুখে পড়েন তাঁরা। পরে পুলিশ সদস্যরা তাঁদের একটি হোটেলে রেখে যান এবং পরদিন বাসায় চলে যেতে নির্দেশ দেন। রাতেই হোটেল থেকে কৌশলে পালিয়ে যান সোহেলের কাছে। সোহেল ও অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি তাঁদের লাকসামের একটি বাড়িতে নিয়ে রাখেন। আগে থেকেই সেখানে আরও তিনজন অবস্থান করছিলেন। পরে নিলয়, নিহাল, সামি ও শিথিলকে কুমিল্লা শহরের একটি মাদ্রাসার মালিক নিয়ামত উল্লাহর কাছে পৌঁছে দেন সোহেল। পরদিন সোহেল চারজনকে নিয়ে ঢাকায় আসেন এবং নিহাল, সামি ও শিথিলকে এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করেন। নিলয়কে একটি লঞ্চে পটুয়াখালীতে পাঠানো হয় বনি আমিনের কাছে। বনি তাঁকে লঞ্চঘাট থেকে নিয়ে হুসাইন ও নেছার ওরফে উমায়েরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিন দিন বনি আমিনের বাসায় রাখা হয় তাঁকে। বাসায় অতিথি আসায় পরবর্তী সময় নিলয়কে হুসাইনের মাদ্রাসায় রেখে আসেন। ১ সেপ্টেম্বর নিলয় মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে কল্যাণপুরে নিজ বাসায় ফিরে আসেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত হাসিব ও রিফাত জানিয়েছেন- এক বছর আগে কুমিল্লার কোবা মসজিদের ইমাম হাবিবুল্লাহর কাছে সংগঠনের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে ধারণা পান। হাবিবুল্লাহ তাঁদের উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করে ফাহিম ওরফে হাঞ্জালার কাছে নিয়ে যান। ফাহিম তাঁদের কুমিল্লার বিভিন্ন মসজিদে নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞান দিতেন ও ভিডিও দেখাতেন। এভাবে তাঁদের সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিতে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়ে আগ্রহী করে তোলা হয়।

পরিবারে স্বস্তি : কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, দুই কলেজছাত্র ইমতিয়াজ আহমেদ ওরফে রিফাত ও মো. হাসিবুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের খবরে উভয়ের পরিবারে স্বস্তি নেমে এসেছে। তবে তাঁদের মুক্তি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। হাসিবুলের মা হাসিনা আক্তার বলেন, হাসিবুল ৮ বছর বয়স থেকে রোজা রাখে, নিয়মিত নামাজ পড়ে। এটা তাঁদের পারিবারিক শিক্ষা। কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হওয়ার মতো কোনো লক্ষণ আগে দেখেননি। তবে ছেলে কারও প্রলোভনে পড়ে ভুল করে থাকলেও তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার জন্য ফিরে পেতে চান। ইমতিয়াজের বাবা ব্যবসায়ী ফয়েজ আহমেদ বলেন, তাঁর ছেলে কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হবে ভাবতেই পারেন না। তাকে ফিরে পেতে চান।


বিষয় : জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ

মন্তব্য করুন