প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। অর্থনীতি, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি দিক বিবেচনা করে আমরা কোনো ঝুঁকির মধ্যে নেই। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও যথেষ্ট। অর্থনৈতিক মন্দা ও সংকট তৈরি হলে এ দিয়ে পাঁচ মাসের খাদ্যসহ আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে। কিন্তু বিশ্ব যদি সমস্যায় থাকে, সে ক্ষেত্রে আমরা কি ভালো থাকব? এ জন্য মানুষের কষ্ট লাঘবে যা কিছু করণীয়, তার সব উদ্যোগই নেওয়া হচ্ছে। আগামী বাজেট নিয়ে এখনই চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে আমরা বিভিন্ন বৈঠক করেছি।

জাতিসংঘের অধিবেশন চলাকালে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে মতবিনিময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁরা বিশ্বময় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করছেন। ২০২৩ সালে অত্যন্ত দুর্যোগময় সময় ঘনিয়ে আসছে বলে মনে করছেন। উদ্বিগ্ন, চিন্তিত ও আতঙ্কে রয়েছেন সবাই।

গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, খুঁটির জোর থাকলে বিদেশিদের কাছে যেত না বিএনপি। জনগণের ওপর তাদের আস্থা ও বিশ্বাস নেই। শেখ হাসিনা আরও বলেন, নির্বাচনে কে অংশ নেবে, কে নেবে না- সেটা যে কোনো রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত। আমরা তো কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না। রাজনীতি করতে হলে দলগুলো নিজেরা সিদ্ধান্ত নেবে। তবে আমরা চাই, অবশ্যই সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। এত দিন কাজ করার পর আমরা চাইব, সবাই নির্বাচনে আসুক। সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ সম্মেলনে যোগদান ও যুক্তরাজ্য সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

এ সময় তিনি ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতাও জানান। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর ডান দিকে ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী। বাঁয়ে ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিকসহ আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, জনগণের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। আর জনগণের যাতে কষ্ট না হয়, তার জন্য কার্যকর সব উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বিলাসবহুল পণ্য কম আমদানির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বড় প্রকল্পের বেলায় চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। জনগণকেও সচেতন থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সারাবিশ্ব অশান্তিতে ভুগছে। করোনাভাইরাস না যেতেই ইউক্রেন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে বিশ্ব। সে অবস্থা থেকে বাংলাদেশ আলাদা নয়। আমরা উৎপাদন বাড়াতে পারলে সমস্যা থাকবে না।

বিদায় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত :একটানা চার দশক আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে আসা শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে একজন কাউন্সিলরও যদি তাঁকে দলের নেতৃত্বে দেখতে না চান, তাহলে তিনি বিদায় নিতে প্রস্তুত রয়েছেন। আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কে থাকবেন কিংবা আসবেন- তা পুরোপুরি কাউন্সিলরদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।

শেখ হাসিনা বলেছেন, আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। মানুষের জন্য কী করতে পারলাম, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। এ জন্যই ভূমিহীনদের ঘর করে দেওয়া হচ্ছে। সব ভূমিহীনকেই ঘর করে দেওয়া হবে। আগামীতে বাংলাদেশের একজন মানুষও ভূমিহীন থাকবে না।
খুঁটির জোর থাকলে বিদেশিদের কাছে যেত না বিএনপি :প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নিজের দেশের মাটিতেই যদি বিএনপির সমর্থন থাকত, যদি তাদের খুঁটিতে জোর থাকত, তাহলে বিদেশিদের কাছে ধরনা দেওয়ার প্রয়োজন হতো না। জনসমর্থন, জনগণের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস থাকলে বিএনপি জনগণের কাছেই যেত। বিদেশিদের কাছে দৌড়ে বেড়াত না। এটাই হলো বাস্তবতা।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, জনসমর্থনের পাশাপাশি জনগণের ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের শক্তি নেই বিএনপির। তারা কোন মুখে জনগণের কাছে ভোট চাইতে যাবে? আগুন দিয়ে পোড়ানো, মানুষ খুন করা, বোমা মারা, গ্রেনেড মারা- সব জায়গায় তো আছে। তারা যদি সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন কী জবাব দেবে বিএনপি? এ জন্যই তারা বিদেশিদের কাছে ধরনা দিয়ে বেড়ায়। দেশের মানুষের কাছে যায় না।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপিকে বাধা দেওয়া হচ্ছে না। তারা যত আন্দোলন-সংগ্রাম করবে, ততই ভালো। কিন্তু পারে না তো। তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে আসুক। এর পরও যদি কেউ না আসে, সেখানে কী করার আছে! আসলে পরাজয়ের ভয়েই নির্বাচনে না আসার কথা বলছে বিএনপি। মিলিটারি ডিক্টেটররা ওভাবেই করেছে- যাদের ওই অভ্যাস, তারা হতো জনগণের কাছে যেতেই ভয় পায়। জনগণের সামনে ভোট চাইতে ভয় পায়।

তিনি বলেন, বিএনপিকে জিজ্ঞেস করলে ভালো হয় যে নির্বাচনটা কে করে দিয়ে যাবে? বিএনপি তাদের অতীতের কথা ভুলে গেছে। বিএনপির সৃষ্টি যেভাবে, একজন মিলিটারি ডিক্টেটরের পকেট থেকে বিএনপির সৃষ্টি। তারপর নির্বাচনের যে প্রহসন, এটা তো তাদেরই সৃষ্টি; বরং আওয়ামী লীগ নির্বাচনটাকে এখন জনগণের কাছে নিয়ে গেছে। ছবিসহ ভোটার তালিকা হচ্ছে। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স দেওয়া হচ্ছে, মানুষ যেন তার ভোটটা দিতে পারে। সেই পরিবেশ বা ভোট সম্পর্কে মানুষের যে সচেতনতা, এটা কিন্তু আওয়ামী লীগই সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগ যতবার ক্ষমতায় গেছে, ভোটের মাধ্যমেই গেছে। নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতায় গেছে। এ দেশে নির্বাচনের যতটুকু উন্নতি, যতটুকু সংস্কার- এটা আওয়ামী লীগ সবাইকে নিয়েই করে দিয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোকে চায়ের আমন্ত্রণ জানানো প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসের প্রভাব চলছে। বর্তমানে আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ কমই হচ্ছে। তাই একটু চিন্তা করতে হবে। তা ছাড়া করোনার কারণে অনেকে আসতেও পারবে না। তিনি গত নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ৩০০ আসনে ৭০০ জনকে মনোনয়ন দিয়ে যখন নিজেরা নির্বাচনে হেরে গেল, তখন সব দোষ দিল আমাদের। জনগণের কাজ করে, জনগণের মন জয় করে, জনগণের ভোট নিয়েই আওয়ামী লীগ বারবার ক্ষমতায় এসেছে।

র‌্যাব সৃষ্টি আমেরিকার পরামর্শে :র‌্যাব কে সৃষ্টি করেছে- এমন প্রশ্ন রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমেরিকার পরামর্শে র‌্যাবের সৃষ্টি হয়েছে। তারাই র‌্যাবের ট্রেনিং দেয়। তারাই অস্ত্র দেয়। হেলিকপ্টার, ডিজিটাল সিস্টেম, আইটি সিস্টেম- সবই আমেরিকার দেওয়া। তাই যেমন ট্রেনিং দিয়েছে, র‌্যাব তেমন করেছে। শেখ হাসিনা আরও বলেন, যাদের দিয়ে সন্ত্রাস দমন করা হয়েছে, তাদের ওপরই কেন নিষেধাজ্ঞা? এ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কার ক্ষতি হচ্ছে- সাধারণ মানুষের ক্ষতি হচ্ছে। কথায় কথায় নিষেধাজ্ঞা, এটা কেমন কথা? তাহলে কি আমেরিকা সন্ত্রাস দমনে নাখোশ?

আমেরিকা নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, তারা আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে যুদ্ধ করে আবার তাদের কাছেই ক্ষমতা দিয়ে চলে গেল। ভিয়েতনামেও তারা যুদ্ধ করেছে। নিজেদের ব্যর্থতার কথা তারা বলে না। আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি গুম হয়। কেউ অপরাধ করলে বাংলাদেশে তার বিচার হয়। কিন্তু পুলিশ ইচ্ছামতো গুলি করে মারলেও আমেরিকায় তাদের সহসা বিচার হয় না। তারা এখন ইউক্রেনে যুদ্ধের সময়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তারা স্বাধীনতার পর অনেক দিন ক্ষমতায় ছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশেরই কিছু লোক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দেয়। দেশের বদনাম করে। আর যারা এটা করে, তারা কোনো না কোনো অপরাধ করে বাংলাদেশ থেকে পালিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরাও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী গুমের অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেছেন, বাংলাদেশে গুমের যে কথা বলা হয়- একজন গুম হয়েছে বলা হলো। পরে দেখা গেল, তিনি খুলনায় নিউমার্কেটে গিয়ে ঘোরাঘুরি করছেন। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গুমের কথা বলছে। দেখা গেল, স্বৈরশাসক জিয়ার সময়ে সবচেয়ে বেশি গুম হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে গুমের তালিকা চাইলে তারা তালিকা দিয়েছে। অবাক করা কাণ্ড হলো, ওই তালিকায় ভারত থেকে পলাতক আসামির নামও রয়েছে। গুমের তালিকায় এমন লোকের নামও রয়েছে, যে আমেরিকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকি ইচ্ছা করে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তির নামও ওই তালিকায় রয়েছে। নিজে থেকে লুকিয়ে থাকার উদাহরণ দিতে গিয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মাকে গুম করা এবং মাকে লুকিয়ে রেখে আরেকজনকে শায়েস্তা করতে মাকে গুম করার ঘটনাও বের হয়েছে।

বাংলাদেশের মাটি কাউকেই ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না :মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সদিচ্ছার অভাব থাকায় বাংলাদেশ থেকে এখনও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন সম্ভব হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার জন্য জাতিসংঘকে কার্যকর ও জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। এমনকি মিয়ানমারের সঙ্গেও কথা হচ্ছে। রোহিঙ্গারা যাতে সম্মানের সঙ্গে তাদের নিজ দেশে ফিরতে পারে, সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উদ্যোগ নিয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে চাপে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে মিয়ানমারের অন্যান্য সীমান্তবর্তী এলাকায় যে ধরনের চাপ রয়েছে, সেটা বাংলাদেশ সংলগ্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় নেই। মিয়ানমারের সামরিক সরকার কারও কথাই শুনছে না। সেখানে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। বাংলাদেশ সেখানে নাক গলাবে না। তবে বাংলাদেশের পবিত্র মাটি কাউকেই ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।