নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বয়ারচরের মানুষ ধান, সবজি ও মাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। চরের বাসিন্দা শাকিল আহমদ তিন একর জমিতে বিভিন্ন জাতের মাছের ঘের করেছিলেন। ঘেরের পাড়েই করেছেন সবজি চাষ। খরচ হয়েছিল প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। ঘের ও সবজিক্ষেত নিয়ে তিনি জীবন বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের হানায় সেই স্বপ্ন চুরমার। শাকিল বলেন, ঘূর্ণিঝড়ে ঘর ভাঙেনি, কিন্তু মেরুদ ভেঙে দিয়ে গেছে। জলোচ্ছ্বাসে মাছ-পোনা সব শেষ।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ে শুধু শাকিল আহমদই নন, অনেক মাছচাষি ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ঘূর্ণিঝড় তছনছ করে দিয়ে গেছে বহু ডেইরি ও পোলট্রি খামারির জীবন। তাঁদের অনেকেরই এখন পথে বসার উপক্রম। সরকার বলছে, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হয়েছে। দ্রুত তাঁদের প্রণোদনা দেওয়া হবে।

মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ে ১৩টি জেলায় ৫ হাজার ৭১৩ হেক্টরের ১৬ হাজার ৭৯৬টি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৫ হাজার ২১৭ ব্যক্তির ২ হাজার ৯১৮ টন মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ ৫৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ১০০টি ট্রলারডুবিতে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং অবকাঠামোর ৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। মোট ক্ষতির পরিমাণ ৬৮ কোটি ২ লাখ টাকা।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১১টি জেলার ৩১৪টি ইউনিয়নে প্রাণিসম্পদ খাতে ১৪ কোটি ৭৮ লাখ ৮৭ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে ৬১৪টি গরুর খামার ও ২৫৭টি পোলট্রি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১ হাজার ৫০০ গরু-ছাগল ও ৯২ হাজার ৪২টি হাঁস-মুরগি মারা যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বরিশাল বিভাগে- ৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের সরকার ১ লাখ ১ হাজার ৪৩২ টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।

মাঠপর্যায়ের মাছচাষিরা বলছেন, সরকারি এই হিসাব পূর্ণাঙ্গ নয়। সরকারি হিসাবের চেয়ে ক্ষতি তিন গুণের বেশি। অবশ্য গতকাল শনিবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এটি প্রাথমিক হিসাব। পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পেতে আরও সময় লাগবে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, ডেইরি খাত এখন চরম বিপদে আছে। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সয়ামিল রপ্তানি চালু রাখা, গম আমদানি কমে যাওয়া, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও লোডশেডিংয়ের কারণে এ খাত কঠিন সংকটকাল পার করছে। এ মুহূর্তে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রান্তিক পর্যায়ে ধুঁকতে ধুঁকতে টিকে থাকা খামারগুলোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশে মাংস ও দুধ উৎপাদন সচল রাখতে সরকারকে দ্রুত সহায়তার হাত বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রি সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, ক্ষুদ্র পোলট্রি খামারিরা বারবার নানা রকম দুর্যোগের মুখে পড়ছেন। খাবারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বহু খামার বন্ধ হয়ে গেছে। এ মুহূর্তে সরকারের বড় রকম সহায়তা ছাড়া প্রান্তিক খামারিরা টিকতে পারবেন না।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, প্রতিবছরই দেশে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ আঘাত হানে। খামারিরা ক্ষতি কাটিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ান। সব দুর্যোগেই সরকার খামারিদের পাশে আছে। এবার তালিকা তৈরি করে নানা রকম প্রণোদনা দেওয়া শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবাই সরকারি সহায়তা পাবেন। এতে তাঁরা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।