ভাটির দেশ হিসেবে নানা দুর্যোগ এ দেশের মানুষের যেন নিয়তি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও এখানে ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। সম্প্রতি আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং আমাদের নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে গেল। 'ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং যে শিক্ষা দিয়ে গেল' শিরোনামে সমকালে গত ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত পাভেল পার্থর নিবন্ধটি পড়েছি। লেখক যেসব পরামর্শ দিয়েছেন, তা দায়িত্বশীলদের আমলে নেওয়া উচিত।
বাজার অর্থনীতিতে পুঁজিপতিদের মুখ্য উদ্দেশ্য উৎপাদন বাড়ানো। কারণ, উৎপাদন বাড়লে বিনিয়োগ বাড়বে; বেচাকেনা বাড়বে। বাজার অর্থনীতির এসব উপাদান ক্রমবর্ধমান হওয়ার অর্থই জিডিপি ফুলেফেঁপে ওঠা, যা আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মান নির্ধারক। জিডিপিকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিবেশ-প্রতিবেশ তথা মাটি, বায়ু, জল, জলাশয় সর্বোপরি প্রাকৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। কারণ অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ সাপ্লাই চেইন ও ডিমান্ড চেইনে মাটি, পানি, জল, বায়ুই প্রধান উপাদান।
উন্নয়নকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপকরা উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ-প্রতিবেশকেও আমলে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। পরিবেশ উপেক্ষা করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন যে টেকসই হবে না; পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে উন্নয়ন মানব জাতির জন্য কল্যাণকর হবে না; বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে নিত্যনৈমিত্তিক দুর্যোগের ঘনঘটা তারই জানান দিচ্ছে। আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে উন্নয়নবিদদের এখানে মতাদর্শিক বৈসাদৃশ্য। এ বৈসাদৃশ্য দূর করে এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ অক্ষুণ্ণ ও প্রকৃতিকে তার জায়গায় রেখে উন্নয়ন এগিয়ে নিতে কল্যাণ অর্থনীতির সঙ্গে পরিবেশবিদ তথা দুর্যোগ ব্যবস্থাপকদের সামগ্রিক উন্নয়নে অন্তর্ভুক্ত করছে উন্নত দেশগুলো।
জাতিসংঘ প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন এ সাক্ষ্য দেয়- বিশ্বে প্রতি বছর ১৮ মিলিয়ন একর বনভূমি উধাও হয়ে যাচ্ছে। এর অধিকাংশই শিল্পায়ন বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে। শুধু উন্নত বিশ্বে নয়; বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিসংখ্যান লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, উন্নয়ন বনাম পরিবেশ প্রতিযোগিতায় কীভাবে পরিবেশ উপেক্ষিত হচ্ছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের যেসব খাল বা নালা জরুরি পানি নির্গমন পথ হিসেবে ব্যবহূত হতো, তা বিভিন্ন শিল্পকারখানা বা সুউচ্চ অবকাঠামো নির্মাণের নামে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা, নাগরিক দুর্ভোগ ও দুর্দশা।
বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে যেখানে স্থাপত্যবিদ ও উন্নয়নবিদদের পরিবেশ-প্রতিবেশকে বিবেচনায় রাখা উচিত ছিল, সেখানে কেন এই উদাসীনতা? দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা উপলব্ধি করতে পারেননি। এক হিসাব বলে, বাংলাদেশের ৭-৮টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা নামে ভিন্ন ডিসিপ্লিনের অধীনে গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা হচ্ছে। অথচ এসব গ্র্যাজুয়েট তাঁদের সাবজেক্ট ওরিয়েন্ট কাজ করার ক্ষেত্র পাচ্ছেন না। কারণ বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, নীতি ও প্রকল্পে টেকসই পরিবেশ এবং স্থিতিশীলতার বিষয়টি বরাবরই উপেক্ষিত। এসব গ্র্যাজুয়েটকে যদি উন্নয়ননীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় তাহলে তা টেকসই ও পরিবেশসহিষুষ্ণ হবে।
শাহবাগ, ঢাকা