কারাগারের নিরাপত্তা হেফাজতে আটক চার জাতীয় নেতাকে পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর কীভাবে, কেন হত্যা করা হয়েছিল এবং কারা এই ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল, এর কুশীলবরা এবং আর এর পেছনে কারা কারা জড়িত ছিল, এসব রহস্যের আজও সুস্পষ্ট কোনো কিনারা হয়নি। 

৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের কোনো কোনো অংশগ্রহণকারী ও সমর্থক পরে প্রচার করেছেন যে, তাঁরা ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের বদলা নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ দাবি ভিত্তিহীন বলেই মনে হয়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পূূর্ণ পাল্টে গিয়েছিল। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানকারীরা ১৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাইলে মুজিবপন্থি একটা রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারতেন। এর জন্য তাঁরা জেলবন্দি চার শীর্ষনেতাকে বের করে এনে তাঁদের হাতে এ সরকার গঠনের ভার দিতে পারতেন। কিন্তু চার নেতার কথা তাদের দূরতম চিন্তা বা পরিকল্পনাতেও ছিল, এমন মনে করার কোনো প্রমাণ তখন দেখা যায়নি। 

হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী পুরো এক দিনেরও বেশি সময় কেটে যাওয়ার পরই কেবল তাঁরা জানতে পারেন যে, চার নেতা জেলখানার ভেতরে নিহত হয়েছেন। জানার পরও এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা বা উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায়নি। প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাঁদের দিয়ে যদি সরকার গঠন করার সদিচ্ছা থাকত, তাহলে তো প্রথম কাজটিই হওয়া উচিত ছিল তাঁদের নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করা এবং তাঁদের বঙ্গভবনে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া। সেরকম কিছুই কিন্তু তখন দেখা যায়নি। বরং নিহত নেতাদের স্বজনরা দোয়েল চত্বরের কাছে তিন নেতার মাজার প্রাঙ্গণে নিহত চার নেতাকে কবরস্থ করার উদ্যোগ নিলে, তাঁদের সে অনুমতিও দেওয়া হয়নি।

লক্ষণীয়, ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানকারীরা ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের খলনায়কদের ৩ নভেম্বর রাতেই নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ দেয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, গৃহযুদ্ধ বাধুক সেটা তারা চায়নি। দু'পক্ষের মধ্যে এই আপস-মীমাংসায় মধ্যস্থতা করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল (অব.) এম. এ. জি. ওসমানী এবং চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান। এর ঠিক দু'দিন পর ৫ নভেম্বরই মোশতাককে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক অভ্যুত্থানকারীরা। এভাবে চিরকালের জন্য ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হন বাংলার ইতিহাসের দ্বিতীয় মীরজাফর খন্দকার মোশতাক। 

তারপরও একটা জিজ্ঞাসা থেকেই যায়, চার নেতাকে কেন খুন করা হয়েছিল। তাঁরা তখন কারাবন্দি ছিলেন, ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানকারীদের পরিকল্পনায়ও তাঁরা ছিলেন না। তাহলে কেন হঠাৎ করে তাঁদের হত্যা করা হলো? এর পেছনে কি অন্য কোনো মহলের অন্য কোনো পরিকল্পনা ছিল? স্মরণ করা যেতে পারে, পাল্টা অভ্যুত্থানের পরদিন ৪ নভেম্বর ঢাকায় বাকশালের ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে একটি শোক মিছিল বের করা হয়েছিল। খালেদ মোশাররফের মা এবং ভাইও সে মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মিছিলের আয়োজকরা কিন্তু তখনও জানতেন না যে, এর আগেই জেলের ভেতরে চার নেতাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তাহলে কেন, কিসের ভরসায় তাঁরা এমন মিছিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

আরেকটি জিজ্ঞাস্য হলো, পাল্টা অভ্যুত্থানকারীরা জেলহত্যার আশঙ্কা বা পরিকল্পনার কথা কি আগেভাগে টের পাননি? ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান দুটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর মধ্যস্তরের কর্মকর্তাদের দুটি গ্রুপ। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কে তেমন কোনো দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধের কথা জানা যায়নি। হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে মোশতাক ও জিয়াউর রহমানের দিকে আঙুল তোলা হলেও সংশ্নিষ্ট আরও অনেককেই সন্দেহের বাইরে রাখা যায় না।

জেলহত্যার বিচারকাজ শুরু হয় হত্যাকাণ্ডের ২৯ বছর পর, ২০০৪-এ, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের শাসনামলে। এ বছরের ২০ অক্টোবর দেওয়া আদালতের রায়ে তিনজন পলাতক সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড, ১২ জন সেনা কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে অভিযুক্ত বিএনপির চারজন সিনিয়র নেতাসহ পাঁচজনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।

আরও চার বছর পর ২০০৮-এর ২৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ জেলহত্যা মামলায় অভিযুক্ত ছয়জন সামরিক কর্মকর্তাকে বেকসুর খালাস দিয়ে দেয়। তবে তাদের মধ্যে চারজন সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা এবং এ. কে. এম. মহিউদ্দীন আহমেদকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০১০-এ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে খালাসপ্রাপ্তদের সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে, যার চূড়ান্ত রায় এখনও পাওয়া যায়নি। 

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে গভীরতম শোক ও কলঙ্কের মসিলিপ্ত দুটি দিন হলো ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস এবং ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস। পাকিস্তানপন্থি স্বাধীনতাবিরোধী সামরিক-বেসামরিক চক্র এ দুই দিনে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদাতা বঙ্গবন্ধুকে, তাঁর রক্তসম্পর্কিতদের এবং তাঁর প্রধান সহায়ক চার নেতাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সমূলে বিনাশ করতে চেয়েছিল। এ দুই দিনে তারা আমাদের শিরদাঁড়ায় যে মারণ আঘাত হেনেছিল, এর জের এখনও আমরা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এরপর দীর্ঘ দুই দশক ধরে তারা আমাদের অবনত করে রেখেছিল, রাজাকার-আলবদরদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিল, খুনিদের পুনর্বাসিত করেছিল, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে তাদের বিচারের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল।

খুনিদের অপচ্ছায়া এখনও বাংলার ভাগ্যাকাশ থেকে সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়নি। এখনও জাতীয় পতাকা বারবার খামচে ধরতে চায় পুরোনো শকুনরা। ১৯৭৫-এর দুটি তারিখ ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর এখনও আমাদের চেতনায় কালো ছায়া বিস্তার করে থাকে। 

আমরা চাই, প্রধানমন্ত্রী খুনি আর খুনের মদতদাতাদের মধ্যে যাদের পরিচয় এখনও জনসমক্ষে উদ্ঘাটিত হয়নি, তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় এনে জাতির ভবিষ্যৎ শঙ্কামুক্ত এবং বিবেককে ভারমুক্ত করুন। ১৫ আগস্ট আর ৩ নভেম্বরের মতো ভয়াল দিনের মুখোমুখি জাতিকে আর কখনও যেন হতে না হয়, তা যে কোনো মূল্যে নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতি হিসেবে বিশ্বসমাজে আমাদের উঁচু মাথা অনাগত দিনগুলোতে আরও উঁচু করতে হবে।