ফুরিয়ে আসছে কার্তিকের দিন। রাজধানীর দ্রুতলয় জীবনে হেমন্তের রংধনু নিখোঁজ। তবু মধ্যদুপুরের নিরুত্তাপ সূর্য হয়তো উস্কে দিয়েছিল আইয়ুব হোসেনের শৈশবের আয়না। স্মৃতির সেই আয়নায় তিনি দেখে নিলেন- ছেলেবেলায় এমন সময়ে নতুন ধান কাটার অপেক্ষার ক্ষণটা। এর পরই পিঠা-পায়েসের উৎসব। দারিদ্র্যের কশাঘাত থাকলেও তাদের ভাঙাচোরা চালাঘরে উঁকি দিত নবান্নের ঘ্রাণ।

হায়! পিঠা তো দূরের স্বপ্ন, এখন চার সদস্যের পরিবারে দু'বেলা ভাত জোটানোই কঠিন থেকে কঠিনতর। পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে দিনভর রিকশা চালিয়েও সুবিধা করতে পারছেন না তিনি। সর্বশেষ জিনিসপত্রের বাড়তি দামের ধাক্কায় একেবারে নুয়ে পড়ার দশা। কোনো রকম টিকে থাকতে প্রতিদিন আরও দু-তিন ঘণ্টা বেশি রিকশা চালানোর তাড়া। তাতে রোজগার কিছুটা বাড়লেও সায় দিচ্ছে না গতর।

আইয়ুবের সঙ্গে কথা হয় ব্যস্ত মগবাজারের নয়াটোলা এলাকায়। বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের লোকেরপাড়া ইউনিয়নের গর্জনা গ্রামের বলমাটা এলাকায়। সেখানেই থাকেন তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান। তিনি থাকেন মগবাজারের আমবাগানের রিকশার গ্যারেজে। রিকশার জন্য গ্যারেজ মালিককে প্রতিদিন ১২০ টাকা জমা দিতে হয়। সমপরিমাণ টাকা দিতে হয় দুই বেলার খাবারের জন্য। রিকশার গ্যারেজে থাকা যায় বিনামূল্যেই- এটাই বাঁচোয়া!

আইয়ুব জানালেন, অভাব তাঁর নিত্যসঙ্গী। তবে সাত-আট মাস ধরে যেন আর কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছেন না। সব জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। সেই অনুপাতে বাড়েনি রিকশা ভাড়া। রিকশা চালিয়ে প্রতিদিন খরচ বাদে তাঁর আয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। আগেও তাঁর আয় এমনই ছিল। তবে দৈনন্দিন খরচ বেড়েছে অনেক। খরচ কমাতে কোনো কোনো দিন সকালে নাশতা খান না। যেদিন খান, সেদিনও যথাসম্ভব কম টাকায় সারার চেষ্টা থাকে তাঁর। গ্যারেজে দুপুর ও রাতের খাবারে তেলাপিয়া বা সস্তায় সহজলভ্য ছোট মাছ ও মাঝেমধ্যে ব্রয়লার মুরগি দেয়। জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় খাবারের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১২০ টাকা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে কমেছে খাবারের মান। মাছ-মাংসের টুকরো আগের চেয়ে হয়েছে ছোট। তবে এটুকু খেতে গিয়েও প্রায়ই তাঁর চোখ আর্দ্র হয়ে আসে। তিনি তো তবু মাছ-মাংস খেতে পারছেন, স্ত্রী-সন্তানদের যে তাও জুটছে না। মাছ-মাংস কেনার সামর্থ্যই যে নেই তাঁর। মাসে একবার বাড়িতে গিয়ে নদী বা মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ ধরেন। সেই মাছ পরিবার নিয়ে খান। আর মাংস বলতে তাঁরা চেনেন ব্রয়লার মুরগি। তাও জোটে এক-দেড় মাস পরপর। কোরবানির ঈদ ছাড়া গরু-খাসির মাংস খাওয়ার সৌভাগ্য হয় না। ঈদের দিন কসাইয়ের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন আইয়ুব। এতে কিছু টাকার পাওয়ার পাশাপাশি মেলে কোরবানির মাংস। সেটা খেয়ে মাংসের তৃপ্তি মেটান। আগে মাঝেমধ্যে ডিম কিনতেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় সেটা উঠেছে বাতিলের তালিকায়।

কথায় কথায় জানা গেল, প্রতি সপ্তাহের রোববার দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠান আইয়ুব। এর মধ্যে ১ হাজার ৮০০ টাকা ঋণের কিস্তি দিতে হয়। সমিতি থেকে ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ঘর তুলেছেন। সেটির কিস্তি দিয়ে বাকি টাকায় যৎসামান্য সবজি, তেল, নুন কেনেন পরিবারের সদস্যরা। জ্যৈষ্ঠ মাসে চড়া সুদে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে ধান কিনেছেন। এ কারণে আপাতত চাল কিনতে হচ্ছে না। তবে চাল ফুরাবে দ্রুতই। তাই আবারও ধান কিনতে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁর দুই ছেলের বয়সের পার্থক্য দেড় বছর। দু'জনই স্থানীয় স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। এর মধ্যে বড় ছেলে করোনার প্রথম ঢেউয়ের পর ঢাকায় এসে একটি পোশাক কারখানায় কাজ নেয়। বাবাকে সাহায্য করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। অবশ্য আইয়ুব তাঁকে জোর করে বাড়িতে পাঠিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ছেলেদের জন্য অর্থসম্পদ তো কিছু রেখে যেতে পারবেন না। লেখাপড়া না শিখলে কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে ওরা? তিনি চান না তাঁর ছেলেরাও রিকশা চালাক বা দিনমজুর হিসেবে কাজ করুক। দুই ছেলেকে ঘিরেই তাঁর স্বপ্নের ফানুস। তবে ছেলেদের জন্য একটু দুধ-ডিম কিনে দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় খুব আক্ষেপ তাঁর। তিনিও বেড়ে উঠেছেন অভাবের ঘরে। তবে তখন সংকট ছিল না এমন তেজি। কার্তিকের টানাটানির দিনশেষে অগ্রহায়ণে নবান্নের ঘ্রাণে পিঠা উৎসবে মাততেন সবাই।


বিষয় : মেলে না আইয়ুবের জীবনের গণিত

মন্তব্য করুন