রাজধানী লাগোয়া বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদী থেকে প্রায়ই উদ্ধার হচ্ছে লাশ। এ দুই নদীর বেশ কিছু নির্জন স্থানকে অপরাধীরা লাশ ফেলার 'নিরাপদ এলাকা' হিসেবে ব্যবহার করছে। পচে-গলে যাওয়ায় অনেক মরদেহ থেকে ফিঙ্গার প্রিন্ট নেওয়া যায় না। বাহ্যিক অবয়ব দেখেও পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই বেওয়ারিশ হিসেবে কিছু কিছু মরদেহ দাফন করা হচ্ছে। এতে মৃত্যুরহস্য থেকে যাচ্ছে অজানা। হত্যা, দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা তাও পরিস্কার করা যাচ্ছে না। রহস্য উন্মোচন না হওয়ায় অপরাধীরা কিছু ঘটনায় থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সর্বশেষ ৭ দিনে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র ফারদিন নূর পরশ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুরন্ত বিপ্লব এবং আরও একটি অজ্ঞাত লাশ পাওয়া যায়। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা ও বালু নদ থেকে ৮৯ মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। তবে উদ্ধার করা লাশের মধ্যে নৌ দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরাও আছেন।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, কোনো অপরাধী চক্র যাতে নদী ও আশপাশ এলাকাকে নিরাপদ মনে না করে সে ব্যাপারে টহল জোরদার করা হয়েছে। নদীতে নৌ পুলিশ আছে। কেরানীগঞ্জের নদী-সংলগ্ন অপরাধপ্রবণ এলাকায় সিসিটিভি লাগানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

গত বুধবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের ফতুুল্লার বুড়িগঙ্গায় এক লাশ ভাসতে দেখে থানায় খবর দেয় এলাকাবাসী। পরে পাগলা নৌ ফাঁড়ি পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে। অজ্ঞাত ব্যক্তির বয়স আনুমানিক ২৫ বছর। তাঁর কান, চোখ ও কপালে কাটা চিহ্ন ছিল। পরিচয় না মেলায় নৌ পুলিশ লাশটি অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করে। এর এক দিন আগে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে শীতলক্ষ্যা নদীতে বুয়েট ছাত্র ফারদিন নূর পরশের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া গত শনিবার পাগলা নৌ ফাঁড়ি পুলিশ বুড়িগঙ্গা নদীর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ পানগাঁও থেকে জাবি ছাত্রলীগের সাবেক

সাধারণ সম্পাদক দুরন্ত বিপ্লবের লাশ উদ্ধার করে। প্রথমে লাশটি অজ্ঞাত ছিল। তিন লাশের মধ্যে ফারদিনের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত হতে পেরেছেন তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা দুরন্ত বিপ্লবের মাথা ও বুকে আঘাতের আলামত দেখে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ধারণা করেছেন, এটিও হত্যাকাণ্ড। ফতুল্লায় বুড়িগঙ্গা নদী থেকে পাওয়া তরুণের পরিচয় এখনও মেলেনি- এটি হত্যাকাণ্ড নাকি অন্যকিছু তা নিশ্চিত নয় কেউ।

ছয় দিনের ব্যবধানে নদীতে বুয়েট শিক্ষার্থী ও জাবির সাবেক ছাত্রসহ তিনজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনা শঙ্কা ছড়িয়েছে সবখানে। প্রশ্ন উঠেছে, শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদী কী লাশ ফেলার নিরাপদ জোনে পরিণত হয়েছে? অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মনে হচ্ছে নদীকে নিরাপদ জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছে অপরাধীরা। তাই হত্যার পর গুম করার উদ্দেশ্যে লাশ নদীতে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে। এখন স্থলপথে অনেক এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা আছে, যে কারণে সেসব এলাকাকে অনিরাপদ মনে করছে তারা।

নৌ পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত ২২ মাসে বিভিন্ন নদী থেকে ৬৭৫ জনের লাশ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হত্যার শিকার ৭৭ জন। মোট লাশের মধ্যে ১৮০ জন শনাক্ত হয়নি। এর মধ্যেও খুনের ঘটনা থাকতে পারে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে নৌ পুলিশের আওতাধীন বিভিন্ন নদীতে লাশ উদ্ধারের সংখ্যা ৩৫৭ জন। এর মধ্যে ১২৩ জনের মৃত্যুর বিষয়ে অপমৃত্যু মামলা হয়েছে সংশ্নিষ্ট থানাগুলোতে। হত্যা মামলা হয়েছে ৩৬টি। ১৯৮ জনের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ৮৮ জনের লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। ফলে এসব লাশ অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এই ৮৮ জন খুনের শিকার নাকি দুর্ঘটনার তা অন্ধকারেই রয়ে গেছে। গত জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত লাশ উদ্ধার হয়েছে ৩১৮টি। এর মধ্যে হত্যার শিকার ৪১ জন। ৯২ জনের লাশের পরিচয় না মেলায় অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা অজানাই থেকে গেছে।

অঞ্চলভেদে নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলে ২০২১ সালে লাশ উদ্ধারের সংখ্যা ৩৮টি। এর আগের বছর ছিল ৩২টি। সে হিসাবে গত বছর লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বেড়েছে ছয়টি। গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৩৫ জনের মৃতদেহ। হাসনাবাদ, সদরঘাট, বরিসুর, বছিলা, আমিনবাজার, আশুলিয়া ও টঙ্গী পর্যন্ত নদীপথ এবং ডেমরা ও রাজাখালী ছাড়াও নরসিংদীর কিছু এলাকা ঢাকা অঞ্চলের আওতাধীন।

গত ১৬ মে সোয়ারীঘাট এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে এক যুবকের লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয় লোকজন। তাদের কাছ থেকে খবর পেয়ে নৌ পুলিশ লাশ উদ্ধার করে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। ৭ মে বছিলা এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে নাসরিন আক্তার নামে ২৬ বছর বয়সী এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। তিনি রাজধানীর মিরপুর থেকে গাবতলীর বর্ধনবাড়ি যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছিলেন। এর দু'দিন পর নদীতে লাশ পাওয়া যায় তাঁর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নদী থেকে যেসব লাশ উদ্ধার করা হয় এর একটি অংশ দুর্ঘটনার শিকার। আবার হত্যার ধরন থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়- হত্যার পর কিছু লাশ নদীতে ফেলা হয়। কোনো কোনো লাশের মাথা ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকে। আবার হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বস্তাবন্দিও মিলছে। অনেক সময় রাজধানীসহ আশপাশ এলাকায় টার্গেট করা ব্যক্তিকে খুন করে লাশ বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদে ফেলা হয়। কখনও কখনও ঢাকার অদূরে ধলেশ্বরী, তুরাগেও মিলছে লাশ।