দেশে এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের এক-তৃতীয়াংশ বেকার। প্রতিবছর চাকরির বাজারে ঢুকছেন ২৬ লাখ তরুণ। তাঁদের মধ্যে সর্বোচ্চ ২০ লাখ তরুণের চাকরির সংস্থান হয়, বাকিরা থাকেন চাকরিহীন। দেশের সরকারি খাত সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থানে সক্ষম। বাকি ৯৬ শতাংশ এখনও বেসরকারি, ব্যক্তিমালিকানা বা আত্মকর্মসংস্থানে জড়িত। সরকারি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) দিচ্ছে এমন তথ্য।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য বলছে, দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা ৫৮। ৫৬টিতে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান। এখান থেকে প্রতিবছর অন্তত ৬০ হাজার গ্র্যাজুয়েট চাকরির বাজারে ঢুকছেন। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা ১০৮। এগুলোর মধ্যে ১০৪টিতে একাডেমিক কার্যক্রম চলমান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিবছর ২ লাখ ৩ হাজার ৬৭৫ গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন।

দেশে সবচেয়ে বেশি গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। সারাদেশের প্রায় ২ হাজার ২০০ কলেজ থেকে বছরে ৮ লাখ ৭২ হাজার ৮১৫ শিক্ষার্থী পাস করে বের হচ্ছেন। এর বাইরে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় মাদ্রাসাগুলো থেকে বছরে ৬০ হাজার, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন স্তরের ৭৭ হাজার ৭৫৬, দুটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৪০, মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ থেকে ১০ হাজার ৫০০, ঢাবির অধিভুক্ত সাত কলেজ থেকে ২৩ হাজার ৩৩০, চার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ৭ হাজার ২০৬, টেক্সটাইল কলেজ থেকে ৭২০, সরকারি ও বেসরকারি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি ইনস্টিটিউট থেকে ৫ হাজার ৬০০, ১৪টি মেরিন অ্যান্ড অ্যারোনটিক্যাল কলেজ থেকে ৬৫৪, ঢাবি ও রাবির অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে আরও ৩ হাজার ৫০০ এবং চবি অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ২৯০ শিক্ষার্থী প্রতিবছর গ্র্যাজুয়েশন শেষ করছেন।

এর বাইরে বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী দেশে ফিরে এসে কর্মসংস্থান খোঁজেন।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, 'আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা চাকরিমুখী, তবু পাস করার পর চাকরির অপেক্ষায় থাকতে হয়।' তিনি বলেন, '৫০ বছর ধরে আমরা যে শিক্ষা দিচ্ছি, তা একান্তভাবেই মুখস্থনির্ভর, পরীক্ষাপ্রধান ও সনদমুখী শিক্ষা। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, চাকরির বাজারে ঢোকার একটা উপায় করে দেওয়া। অথচ এটি কখনও কোনো শিক্ষাব্যবস্থার দর্শন হতে পারে না।'

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির (২০১০) সদস্য অধ্যাপক নিতাই চন্দ্র সূত্রধরের মতে, 'আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেন অনার্স, মাস্টার্স পাসের মেশিন। আমরা বুঝে হোক, না বুঝে হোক প্রচুর গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি। অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছি না। বৃত্তিমূলক শিক্ষায় এখনও মানুষের অনাগ্রহ লক্ষ্য করার মতো। অথচ এটি হতে পারত মুক্তির উপায়।'

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে অভিযোগের তীর : সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও সমালোচনা হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের নিয়ে। বর্তমানে সারাদেশে ৮৮১ কলেজে অনার্স পড়ানো হয়। পর্যাপ্ত শিক্ষকসহ অন্য সুযোগ-সুবিধা না বাড়িয়ে এভাবে অনার্স চালু করায় মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক তদবির ও নানা কারণে এ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অতীতে যেখানে-সেখানে অনার্স চালু করেছে। এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তাদের এক সুপারিশে বলছে, যত্রতত্র আর অনার্স কোর্স খোলার অনুমতি দেওয়া হবে না।

বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকা, মফস্বল ও উপজেলা পর্যায়ের কলেজগুলোতে পর্যাপ্ত ভৌত অবকাঠামো, সুপরিসর শ্রেণিকক্ষ, পাঠাগার ও সেমিনার কক্ষ এবং প্রতিটি বিষয়ে অন্তত সাতজন শিক্ষক না থাকলে কোনোভাবেই আর অনার্স খোলার অনুমতি না দিতে সুপারিশ করে কমিটি। সরকারের এ নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা চিঠি দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও দেওয়া হয়।

জানা গেছে, যত্রতত্র অনার্স খোলার নেপথ্যে রয়েছে নিয়োগ-বাণিজ্য। সরকারের নজরদারির অভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডিগ্রি কলেজগুলোতে খোলা হচ্ছে অনার্স কোর্স। নামমাত্র অনুমতি নিয়ে অনার্স কোর্সের নামে কলেজগুলো নিয়োগ-বাণিজ্য করছে বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে ডিগ্রি কোর্সের শিক্ষার্থী কমছে, অন্যদিকে বেশি খরচে মানহীন কলেজগুলোতে পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

গত ২১ অক্টোবর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময়ে উপাচার্য অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান বলেছিলেন, 'নতুন করে আর অনার্সের পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। দুই বছর ধরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনার্সে অধিভুক্তি দিচ্ছে না। নতুন কলেজে অনার্সে অধিভুক্তি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনাও নেই। তবে অদূর ভবিষ্যতে যদি কখনও নতুন বিষয়ে খুব প্রয়োজন হয়, তখন বিবেচনা করা হতে পারে।

ইউজিসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক দিল আফরোজা বেগম সমকালকে বলেন, 'শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য শুধু গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা নয়, মানসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কথা মাথায় রেখে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ, যোগ্য, প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য। ইউজিসিও সে জন্যই কাজ করে যাচ্ছে।'