দেখতে দেখতে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল, তবুও মনে হয় এই তো সেদিন! তাঁর কথা শুনেছি; সান্নিধ্য পেয়েছি। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন- 'পৃথিবীতে এসেছিস, দাগ কেটে যা।' অর্থাৎ স্রোতের মতো বহমান এই সময়ে নিজের চিহ্ন রাখতে দাগ কাটতে হবে। সেই দাগ তিনি কাটতে পেরেছেন। তাই লোকান্তরিত হয়েও তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কর্মে। তিনি সুধাংশু নাথ মণ্ডল। প্রয়াত হয়েছেন ২০১৯ সালের ২১ নভেম্বর। অনেকটা অকস্মাৎ, অনেক কিছুই অসমাপ্ত রেখে তাঁর সেই চলে যাওয়া।

সুধাংশু নাথ মণ্ডল শিক্ষকতা করেছেন আদর্শকে ধারণ করে। আর সামাজিক কাজে যুক্ত ছিলেন দায়িত্ববোধে। লিখেছেন ভেতরের তাগিদে, সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায়। সে কারণেই তাঁর লেখা সুখপাঠ্য। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লিখেছেন 'সমাজ দর্পণ'সহ বিভিন্ন পত্রিকায়। তাঁর লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে ভাবলে অবাক হই, কীভাবে সম্ভব! হ্যাঁ, সম্ভব ছিল তাঁর নিজস্ব মনন-চিন্তনের কারণে।

সমৃদ্ধ হতে চেয়েছি তাঁর কাছে গিয়ে। শুনেছি ভ্রমণ কাহিনি। সুযোগ পেলেই তিনি বেরিয়ে পড়তেন ভ্রমণে। দৃষ্টি ফেলেছেন প্রকৃতি, সমাজ ও পরিবেশে। নির্ণয় করেছেন আপনবোধের নিরিখে, নিজস্ব অনুভূতি দিয়ে। তাই সহজেই তিনি ধরতে পারতেন সংগতি-অসংগতি। বিশেষ করে হিন্দু (সনাতন) সম্প্রদায়ের মধ্যে সংস্কৃতিগত নানা কুসংস্কার, অসংগতি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন সুধাংশু নাথ মণ্ডল। আবার মূল্যায়ন করে সঠিক পথও বাতলে দিয়েছেন। এসব নিয়ে অনেক লিখেছেন পত্র-পত্রিকায়। তাই তো আমার কাছে শিক্ষকতার মানদণ্ডে একজন আদর্শ শিক্ষক ছাড়াও তিনি লেখক ও হিন্দু সমাজ সংস্কারক।

তাঁর লেখা বই 'ত্রিবেণী তীর্থ পথে' নিছক ভ্রমণ কাহিনি নয়। বহু পথ ঘুরে আহরিত জ্ঞান তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন এই বইয়ের পাতায়। ভ্রমণ মূল উপজীব্য হলেও বইটিতে ধর্ম, সমাজ, পরিবেশ ও সাহিত্যের স্বাদ মেলে অনায়াসে। তাই অনেকের কাছেই বইটির গুরুত্ব আলাদা। রংপুর বেতারে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তিনি যেসব আলোচনা করতেন, তা আজও শ্রোতাদের মুখে মুখে; রেফারেন্স হয়ে।

খুব মনে পড়ে তাঁর সঙ্গে শেষ দেখার স্মৃতি। সেদিন তিনি আমাদের বিস্কুট-চা খাইয়েছেন। তাঁর সেদিনের কথাগুলো কেন জানি অমিয় বাণী মনে হয়েছিল! আজও কানে বাজে তাঁর আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর। ভীষণ আশাবাদী মানুষ ছিলেন তিনি। শোনাতেন ভালোবাসার কথা, জ্ঞানের কথা। একবারও বুঝতে পারিনি, সে দেখাই হবে শেষ দেখা। ভাবতে পারিনি, আশাজাগানিয়া অনেক স্বপ্ন দেখিয়ে দ্রুতই তিনি চলে যাবেন পরপারে।

তাঁর সান্নিধ্যে, স্নেহমাখা করতলে যা পেয়েছি, আমার জন্য অনেক। তবুও অনেকের মতো ভাবি, তাঁর চলে যাওয়া যেন সময়ের আগেই! কেননা, তাঁর কাছে আরও পাওয়ার ছিল। হয়তো তাঁরও দেওয়ার ছিল।

সুপ্রকাশ সাহিত্য সংসদের উপদেষ্টা সুধাংশু নাথ মণ্ডল বেঁচে আছেন তাঁর কর্মে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে জন্ম নেওয়া উজ্জ্বল বর্ণের পরিশীলিত এই মানুষটি ২০০২ সালে শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছিলেন। মার্জিত রুচিবোধের পরিচয় ছিল তাঁর চলাফেরা, কথা বলায়। নানা প্রজাতির গাছপালায় ঢাকা গ্রামের বাড়িতে বসবাস করে তিনি শুধু পড়তেন আর লিখতেন। প্রতিবেশী ও ছাত্রছাত্রীরা বেশিরভাগ সময় তাঁকে সেভাবেই খুঁজে পেতেন। কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন অনেক সম্মাননা ও সংবর্ধনা। তবে মনে করি, তাঁর প্রতি সবার যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা, সেটাই তাঁর ৮০ বছরের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্মাননা। আজ তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাভরে প্রার্থনা- স্বর্গ পেরিয়ে তাঁর মোক্ষপ্রাপ্তি ঘটুক। তাঁর রেখে যাওয়া কর্ম আমাদের পাথেয় হয়ে সুধা ঢালুক।

কঙ্কন সরকার: সাধারণ সম্পাদক, সুপ্রকাশ সাহিত্য সংসদ, সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা