মিসরের শার্ম আল-শেখের জলবায়ু সম্মেলন তথা কপ২৭ বৈঠক শেষ হয়েছে কিছুটা সুখবরের মাধ্যমে। 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ' চুক্তির মাধ্যমে উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো জলবায়ুর অভিঘাতে বিপর্যস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সম্মত হয়েছে। কিন্তু এই নিঃসরণ কমানোর জন্য তারা কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। অথচ সেটিই জরুরি। এ ছাড়া তাদের ক্ষতিপূরণের সম্মতির কোনো মানে নেই। কপ২৭ সম্মেলন জলবায়ুর দিক থেকে একটি সফল আয়োজন হতে পারত। তা না হয়ে এটি প্রতি বছরের সার্কাসের মতো হয়েছে। এটি অবিশ্বাস্য, ২৭টি জলবায়ু সম্মেলনের কোনোটিতেই বিশ্বের জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। ১৯৯৫ সালে জার্মানির বার্লিনের কপ১ থেকে শুরু করে এ বছরের মিসরের সম্মেলনও শেষ হলো। কিন্তু কার্বন নিঃসরণ চলছেই। মাঝে করোনা মহামারির কারণে কিছুটা কমলেও নিঃসরণ থেমে নেই।

গত বছর গ্লাসগোর কপ২৬ জলবায়ু সম্মেলনের পর মিসরের আয়োজন নিয়ে তেমন উচ্চাশা ছিল না। এমন দেশে সম্মেলনটি হয়েছে, যেখানে চলছে স্বৈরশাসন। কোকা-কোলা ছিল এ সম্মেলনের স্পন্সর; যে কোম্পানিটি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক দূষণকারী। সম্মেলনে ছয় শতাধিক জীবাশ্ম জ্বালানি প্রতিনিধি অংশ নেন, যাঁরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে তাতে বাধা দেওয়ার জন্যই উপস্থিত ছিলেন। অনেকেই বলছেন, এটি সর্বকালের খারাপ জলবায়ু সম্মেলন।

১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন কনভেনশন ফ্রেমওয়ার্ক- ইউএনএফসিসি নিয়ে আমি কখনোই প্রশ্ন করতাম না। এমনকি কপ সম্মেলন নিয়েও না। কারণ এগুলোর মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা হয়। কিন্তু এখন করছি। কারণ আমার কাছে বিস্ময়কর ঠেকে যখন দেখি প্রতি বছরের এই চর্চা বিশ্ব মিডিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার হয়। সত্যি বলতে, এসব সম্মেলন কিছু প্রেসিডেন্ট আর প্রধানমন্ত্রীর ছবি তোলার মহড়ার মঞ্চ, যাতে বিশ্ব মনে করে, তাঁরা সত্যি উদ্বিগ্ন। বাস্তবতা আসলে ভিন্ন।

যে কারণে অন্য বড় সমস্যাও তৈরি হয়েছে। বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপারে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ দেশই সে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তৎপর নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে যেখানে আফ্রিকার দেশগুলো ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত এবং সে জন্য কপ২৭ সম্মেলনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি ছিল। প্রয়োজন ছিল বিশ্ব যেভাবে উষ্ণ হচ্ছে, তার বিপরীতে পদক্ষেপ নেওয়া। জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের কাছে জিম্মি হয়ে সে আলোচনা বছরের পর বছর ধরে কোনো কাজে দিচ্ছে না। তার মানে, কপ সম্মেলন আসলে তার লক্ষ্য অর্জনেও ব্যর্থ। কপ সম্মেলনগুলো এতটাই অসহায়; যথেষ্ট পদক্ষেপের অভাবে এটি কার্যকারিতা হারিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এ মঞ্চের ভূমিকা গৌণ হয়ে পড়ছে।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় নীতি ও প্রক্রিয়া আলোচনায় বিশেষজ্ঞ হওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি না। তবে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। এভাবে কপ সম্মেলন ব্যর্থ হলে তার স্থলে নতুন কী আসবে?

এ অবস্থায় এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যেটি কম কষ্টকর এবং সহজে বাস্তবায়নযোগ্য। জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে প্রয়োজন হলো শূন্য কার্বন নিঃসরণ। কার্বন নিঃসরণ যত হবে, জলবায়ু সংকট বিশ্বব্যাপী তত বাড়বে। এ বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। সেটি খুব বেশি দেখা না যাওয়ার কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের মধু তারাও খায়। এ বিষয় সামনে নিয়েও এগোতে হবে। সে লক্ষ্যে ছোট ছোট কমিটি বা প্রতিষ্ঠান গড়া দরকার, যারা সংশ্নিষ্ট খাত তদারকি করবে। যেমন জ্বালানি-কৃষি-বন উজাড় হওয়ার কারণে এবং পরিবহন খাতের মাধ্যমে কতটুকু কার্বন নিঃসরণ হয়; তার ফলে কী ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি হয়। এর বাইরে অন্য কোনো খাতের ভূমিকা থাকলে সেটিও সামনে আসতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠান স্থায়ী ও পূর্ণকালীন হিসেবে কাজ করবে।

তাদের পরস্পরের মধ্যে লিয়াজোঁ থাকবে এবং বছরে কিছু সময় একত্রে থেকে কাজ বা পর্যালোচনা করবে।

এসব প্রতিষ্ঠানে যেমন উন্নত বিশ্বের প্রতিনিধি থাকবে, তেমনি উন্নয়নশীল দেশ, সর্বোপরি বিশ্বের অধিকাংশ দেশের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি সংশ্নিষ্ট দেশের সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। সেখানে তারা বাস্তবসম্মত চুক্তি করবে। বন নিধনের ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা সামনে আনবে। মিথেন নিঃসরণ কীভাবে কমানো যায়, সেই বিকল্প দেখাবে এবং কয়লার ব্যবহার কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। যখন সরকারগুলো সব শর্ত মানবে, তখন চুক্তি স্বাক্ষর হবে। এ জন্য বৈশ্বিক সম্মেলনেরও প্রয়োজন হবে না।

সত্তরের দশকে অর্থনীতিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ইএফ সুমাচার লিখেছেন, অর্থনীতির দিক থেকে ছোট মানে সুন্দর। এ বিষয়টি আমরা বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে আন্তর্জাতিক আলোচনার ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে পারি। কপ২৭-এর ব্যর্থতার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া আরও জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিল ম্যাকগায়ার: প্রফেসর ইমেরিটাস, জিওফিজিক্যাল অ্যান্ড ক্লাইমেট হ্যাজার্ডস, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন; গার্ডিয়ান থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তরিত