ভোরের কুয়াশা ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে সকালের সোনামাখা রোদ। এমন মিষ্টি সকালে রাজশাহী থেকে গাড়িতে যাত্রা শুরু নাটোরের বাগাতিপাড়ার বাঁশবাড়িয়া গ্রামের উদ্দেশে। গ্রামের মেঠোপথে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের সোনালি ধান। পাকা ধান মুখে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখির ঝাঁক। রাস্তার দুই ধারে সারি সারি আম বাগান। গাছের ফাঁক দিয়ে যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই ফসলের মাঠ। ভালো ফলনে হাসি ফুটেছে কৃষকের মুখে। গ্রামে গ্রামে ধান তোলার উৎসবের আমেজ।

গাড়ি থেকে নামতেই এগিয়ে আসেন কয়েকজন কৃষক। কথা হয় মেহরাজুল ইসলাম প্রিন্সের সঙ্গে। তিনি ঢাকায় একটি বায়িং হাউসে চাকরি করতেন। রাজধানীর ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি পাস করেন। বছর তিনেক আগে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পৈতৃক জমিতে চাষাবাদে মনোযোগ দেন প্রিন্স। তিনি ১০ বিঘা জমিতে ব্রি৮৭ ধান চাষ করেছেন। এই তরুণ বলেন, এক সময় স্বর্ণা ধান চাষ করতাম। কিন্তু স্বর্ণা বেশ মোটা। ফলনও কম। রোগে আক্রান্ত হয়। পরবর্তী সময়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শে গ্রামের তিন-চারজন ব্রি৮৭ জাতের ধানের আবাদ শুরু করি। তখন অনেকেই আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করেছে। এখন ব্রি৮৭ ধানের ফলন দেখে পুরো গ্রামের কৃষকই এটি চাষ করেছেন। গ্রামের মানুষও ভালো ফলন পেয়ে খুশি।

মেহরাজুল ইসলাম প্রিন্স আরও জানান, ব্রি৮৭ চাল বেশ চিকন। বাজারমূল্যও বেশি। প্রতিমণ ধান ১ হাজার ৩৫০ টাকা করে পাওয়া যাচ্ছে। এ ধান ব্লাস্ট প্রতিরোধী। গাছ শক্ত, শিষ বড়। বাতাসে হেলে পড়ে না। পোকার আক্রমণ নেই, জীবনকালও কম। হেক্টরপ্রতি সাড়ে ৭ টন ফলন পাওয়া যাচ্ছে। ব্রি৮৭ ধান এখন সব কৃষকের কাছে জনপ্রিয়।

পুরো গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে মাঠে চলছে হইচই- আর কৃষকও উল্লসিত। বাড়িতে কৃষানিদেরও ব্যস্ততার কমতি নেই। নতুন এ জাতের ধানের ভালো ফলন পেয়ে কৃষকের মনে উঁকি দিচ্ছে খুশির দোলা।

বাঁশবাড়িয়া গ্রামের মজিবুর রহমান আম বাগানে ব্রি৮৭ ধান চাষে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, এক সময় আম বাগান সারাবছর খালি পড়ে থাকত। ব্রি৮৭ ধানের গাছ বেশ শক্ত হওয়ায় কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। আমের পাশাপাশি ধানও পাওয়া যাচ্ছে। ফলনও ভালো। তাঁর দেখাদেখি গ্রামের অন্য আম বাগানের মালিকরাও একই পথে হাঁটছেন।

কৃষক আব্দুর রহিম গত ১০ বছর ধরে ১০ বিঘা জমিতে আমন মৌসুমে ভারতীয় উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের ধান 'স্বর্ণা' চাষ করছেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এ ধানের ফলন কমছে। প্রতি হেক্টরে পাঁচ টনের বেশি ধান পান না। পোকার আক্রমণ হয় বেশি। চাল মোটা হওয়ায় দামও বেশি পাওয়া যায় না। ফলে স্বর্ণা ছেড়ে এখন ব্রি৮৭ ধান চাষে ঝুঁকেছেন তিনি। এই কৃষক বলেন, ব্রি৮৭ ধানের বীজ সংরক্ষণ করা যায়।

ধান চাষিরা জানান, ব্রি৮৭ জাতের চিকন ধান প্রতি ৩৩ শতাংশ জমিতে ২৭ থেকে ৩০ মণ পর্যন্ত ফলন হয়ে থাকে। স্বর্ণা ধানের জীবনকাল ১৪৫ দিন আর ব্রি৮৭ চিকন আমন ধানের জীবনকাল ১২৭ দিন। স্বর্ণা ধান কাটার গড়ে ১৫ দিন আগেই কাটা যায় ব্রি৮৭ জাতের চিকন আমন ধান। মোটা জাতের স্বর্ণা ও গুটি স্বর্ণা ধান বাজারে বিক্রি করতে গেলে মহাজনরা কথাই বলতে চান না। তবে ব্রি৮৭ জাতের চিকন আমন ধান আড়তদার, চাতাল মালিক ও মহাজনরা আগ্রহ নিয়ে কিনছেন।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ জাতের ধানে চিটা নেই বললেই চলে। আগাম ফসল কাটতে পারায় ওই জমিতে এখন সরিষা, আলুসহ অন্যান্য রবি শস্য চাষ করার উৎসাহ পেয়েছেন কৃষকরা। বাম্পার ফলনের খবরে প্রতিদিনই আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক দেখতে আসছেন নতুন জাতের ধান। তাঁরাও আগামীতে উচ্চ ফলন পেতে এই ধান চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

শুধু নাটোর নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখন ব্রি৮৭ ধানে ধন্য ফলন। ফলনে আমনের সব ধানকে পেছনে ফেলেছে ব্রি৮৭। সারাদেশে জাতটি ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। আমন মৌসুমে ব্রি৮৭ চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে মাঠে আছেন ব্রির কর্মকর্তারা। নিচ্ছেন নানা পদক্ষেপ।

ব্রি রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. ফজলুল ইসলাম বলেন, রাজশাহী অঞ্চলে ৮৩৭টি ব্লক রয়েছে। প্রতিটি ব্লকে এক বিঘা করে প্রদর্শনী করার জন্য বীজ সহায়তা দিয়েছি। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সার দেওয়া হয়েছে। ব্রি৮৭ ধান কেটে সরিষা, মসুর ডাল, ছোলাসহ বিভিন্ন ডালজাতীয় ফসল আবাদ করা যাবে। নির্ধারিত মৌসুমের সময় অনুসারে এবং সরিষা তুলে বোরো চাষ করা যাবে অতি সহজে।

ব্রি-র মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর বলেন, ব্রি উদ্ভাবিত নিত্যনতুন এ জাতগুলো খাদ্য সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে। আমাদের উদ্ভাবিত ১০৮টি জাতের মধ্যে অনেকই উচ্চ ফলনশীল। এসব জাত চাষের কারণে আগামীতে খাদ্য সংকটের কোনো শঙ্কা নেই। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ব্রি-র আরও তিনটি জাত উন্মুক্ত হবে। যেগুলোর ফলন আগের জাতের চেয়ে অনেক বেশি। আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। তিনি বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে উচ্চ ফলনশীল ব্রি৮৭ ধানটির আবাদ সম্প্রসারণে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। অল্পদিনের মধ্যেই ব্রি৮৭ ধান আমন মৌসুমের প্রধান শস্যে পরিণত হবে।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, কিছু দিন আগে নিজ বাড়ি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর উপজেলার মুশুদ্দি গ্রামে গিয়েছিলাম। এ সময় ব্রি৮৭ ধানের আবাদ দেখে আমার বুক ভরে গেছে। এ বছর সারাদেশেই ধানটি চাষ হয়েছে। ফলন বেশি হওয়ায় কৃষকদের এ ধানের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ। আমরা ব্রি৮৭ ধানের আবাদ বাড়াতে কাজ করছি। এ ধান চাষ করতে পারলে একই জমি থেকে ধান উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।