বাংলাদেশ ও জাপান সম্পর্ককে কৌশলগত পর্যায়ে নিতে একমত। সম্প্রতি জাপানের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরে এসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠককালে এমন আশাবাদই ব্যক্ত করে দুই দেশ। প্রধানমন্ত্রীর স্থগিত হয়ে যাওয়া টোকিও সফরে দুই দেশের সম্পর্ক একধাপ এগিয়ে কৌশলগত অংশীদারিত্বের পর্যায়ে উন্নীত হতো। তবে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে অপেক্ষা করতে হবে দুই দেশকে। তবে জাপানের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় টোকিওর সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সফর স্থগিতসহ দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকির সাক্ষাৎকার নেয় চ্যানেল টোয়েন্টিফোর। সেখানে জাপানে করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রধানমন্ত্রীর সফর স্থগিত হওয়া নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকার জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেন, আমরা জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সফরের দিনক্ষণ নির্ধারণ নিয়ে কাজ করছি। আর এটাই দুই দেশের সরকারের চাওয়া। যখন এ সফরটি হবে, তখন দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাপানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, নতুন করে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। আমরা সফরটি সফল করা নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করছি। তা স্থগিতের কারণ যাই হোক না কেন, আমাদের পরিশ্রম চালিয়ে যেতে হবে। জাপান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।

সফরটিতে চাওয়া-পাওয়ার জায়গা থেকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা বহুগুণ বেড়েছে। ১০ বছর আগেও যে সহযোগিতা ৩০ কোটি ডলার ছিল, তা গত দুই বছরে ৩০০ কোটি ডলারের ওপর গিয়েছে। যা থেকে পরিস্কার বোঝা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান এবং অবকাঠামো উন্নয়নের উচ্চ চাহিদা রয়েছে। জাপানের অগ্রাধিকার হচ্ছে, মানসম্পন্ন অবকাঠামো নির্মাণ। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে শিল্পের বৈচিত্র্যকরণ এবং প্রযুক্তিসম্পন্ন ভারী শিল্প করতে চায় জাপান। আর সেই সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন জাপানের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। জাপান এ বিষয়গুলোতে তার সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। যাতে করে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন যাত্রায় সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারে।

বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে আন্তর্জাতিক মুদ্র তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ নেওয়াকে স্বাগত জানিয়ে ইতো নাওকি বলেন, আমি আশা করি, আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ চুক্তি বাস্তবায়ন করবে। এ বছর বাংলাদেশ সরকার জাপানের কাছে ৭৫ কোটি ডলার বাজেট সহযোগিতার অনুরোধ করেছে। করোনার মধ্যে দুই দফায় বাজেট সহযোগিতা করেছে জাপান, যা মোট ৭৫ বিলিয়ন ইয়েন। এ অর্থনৈতিক সংকটে বাংলাদেশকে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, তা বিবেচনা করছিল জাপান। এখনও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

এদিকে গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের পরবর্তী তারিখ জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, যখন পরিস্থিতি তৈরি হবে, তখন নতুন তারিখ ঠিক করা হবে। এ সফরটি দুই বছর আগে ২০২০ সালে হওয়ার কথা ছিল। পরে কভিড হয়, আর যাওয়া গেল না। কভিড এখনও রয়েছে। এখন দলবল গেলে কয়েকজনের জন্য জাপান সরকার ছাড় দেবে। অন্যদের কিন্তু করোনার বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সফর করলে বড় দল যায়। এখানে যদি সবার কোয়ারেন্টাইন করতে হয়, এটি সম্ভব হবে না। এ ছাড়া জাপানে সরকারের মধ্যেও একটু অসুবিধা চলছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পর্যবেক্ষণ করছে এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরে কখনও যাওয়া হবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত দিক থেকে সম্পর্কে প্রতিরক্ষায় জাপানের সহযোগিতা নিয়ে জানতে চাইলে জাপানের রাষ্ট্রদূত বলেন, গত আট বছরে দুই দেশের সম্পর্ক অনেক বেড়েছে। যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা, নীতির স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রার কারণে হয়েছে। আঞ্চলিক কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে এ অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ভূমিকার কারণে জাপান বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চায়। যখন কৌশলগত অংশীদারিত্বের কথা বলা হয়, তখন শুধু নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাই নয়, দ্বিপক্ষীয় সব বিষয়েই সম্পর্ক এগিয়ে যায়। সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় যায়।

নিরাপত্তা সহযোগিতা অন্যতম বিষয় জানিয়ে তিনি বলেন, এতে দ্বিপক্ষীয় প্রশিক্ষণ, কর্মকর্তা বিনিময়সহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযেগিতার ক্ষেত্র বাড়ে। তবে সেই সঙ্গে আমরা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সহযোগিতায় গুরুত্ব দিচ্ছি। রাডার সিস্টেমসহ বেশ কিছু পণ্যের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এতে আগ্রহ দেখিয়েছে। আমরা এ নিয়ে কাজ করছি।

বাংলাদেশের সমরাস্ত্র কেনা নিয়ে তিনি বলেন, সম্প্রতি মিতসুবিসি ফিলিপাইনে মোবাইল রাডার ব্যবস্থা দিয়েছে। এ মুহূর্তে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি চাপে রয়েছে। কিন্তু যখন এ পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে, তখন জাপান আশা করে, বাংলাদেশ এ সমরাস্ত্র কিনবে। আমি আশা করি, বিভিন্ন দেশ ছাড়াও বাংলাদেশ জাপান থেকেও সমরাস্ত্র কিনবে।