এবারের মাধ্যমিকের ফল দ্বিমুখী। মেধাবীরা আরও এগিয়ে গেছে, আর পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়েছে। জিপিএ ৫ অর্জন করেছে অনেক শিক্ষার্থী। সংখ্যার বিচারে তা পৌনে তিন লাখের কাছাকাছি। নজরকাড়া সাফল্য তাদের। পাশাপাশি ফেলের হার গত বছরের চেয়ে বেড়েছে।
সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুলত চার কারণে এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে এমন বৈপরীত্য দেখা গেছে। সেগুলো হলো- কম সিলেবাসে পরীক্ষা, পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন বাছাইয়ের সুযোগ বেশি থাকা (চয়েস অব অপশন বেড়ে যাওয়া), যেসব বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া হয়নি সেগুলোতে সাবজেক্ট ম্যাপিং করা এবং গতবারের চেয়ে বেশি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া। এ চার কারণের মধ্যে প্রথম তিনটিতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এগিয়ে গেছে। আর শেষের কারণটি ফেলের সংখ্যা বাড়িয়েছে। পাসের হার কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেশের শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানদের কেউ কেউ এ বছর ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণটিও উল্লেখ করেন। গত বছর মাত্র তিন বিষয়ের পরীক্ষা হয়েছিল। সেবার ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজি ও গণিতের মতো 'কঠিন' বিষয়ে অবতীর্ণ হতে হয়নি।

ফল বিশ্নেষণে দেখা গেছে, শীর্ষে রয়েছে যশোর বোর্ড। পাসের হার ৯৫ দশমিক শূন্য ১৭ শতাংশ। আর পাসের হার সবচেয়ে কম সিলেটে- ৭৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। এ দুই বোর্ডের পাসের হারের পার্থক্য ১৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সিলেট বিভাগের চার জেলার পাসের হার কম হওয়ার কারণে সারাদেশের গড় পাসের হারে ধাক্কা লেগেছে। তবে কয়েক বছরের মতো এবারও ফলে নজর কেড়েছে ছাত্রীরা। পাসের হার ও জিপিএ ৫প্রাপ্তি, সবকিছুতেই তারা সেরা। পাসের হারে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা শীর্ষে থাকলেও পাসের সংখ্যা বিচারে মানবিকের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে।

এবারের মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা ২০২০ সালে যখন নবম শ্রেণিতে উঠেছিল; ক্লাস শুরু হতে না হতেই মার্চে বন্ধ হয়ে যায় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। করোনায় বিপর্যস্ত হয় শিক্ষা ব্যবস্থা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংক্ষিপ্ত করে ফেলা হয় মাধ্যমিকের সিলেবাস। স্বল্প দিনের ক্লাস শেষ করে ছাত্রছাত্রীরা গত সেপ্টেম্বরে বসে পরীক্ষায়। সব বিষয়ে নয়; শুধু ৯টি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। বাকিগুলো নবম, অষ্টম শ্রেণির জেএসসি, জেডিসি পরীক্ষায় এই শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরের সাবজেক্ট ম্যাপিং করা হয়। এবার যেসব বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে সেগুলো হলো- বাংলা দুই পত্র, ইংরেজি দুই পত্র, গণিত, গ্রুপভিত্তিক তিনটি ঐচ্ছিক বিষয় এবং চতুর্থ বিষয়।

রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তায়েফ উল হক সমকালকে বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সারাদেশের শিক্ষার্থীরা ও তার পরিবারের স্বজনরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিশেষ করে এই সময়টাতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পরও শিক্ষার্থীরা এবার যে ফল করেছে, সেটা অনেক ভালো বলে আমি মনে করি।

ফল বিশ্নেষণ করে শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানদের সমন্বয়ে গঠিত 'আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব কমিটি'র সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার সমকালকে বলেন, সব মিলিয়ে এবার ফল ভালো। গত বছরের ফলের সঙ্গে তুলনা করলে ফল খারাপ মনে হতে পারে। তবে ২০১৯, ২০২০ সালের ফলের সঙ্গে তুলনা করলে দেখবেন, কাছাকাছিই আছে রেজাল্ট। পাসের হার কমে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২১ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় মাত্র তিন বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। এবার নেওয়া হয়েছে ৯ বিষয়ের। বিষয় বেড়ে যাওয়ায় তাই পাসের হার স্বাভাবিকভাবেই কমেছে। আর গতবার সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ে জেএসসি, জেডিসি থেকে নম্বর নেওয়া হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা তেমন একটা ভালো করে না। এবার সাবজেক্ট ম্যাপিং করা হয়েছে নবম শ্রেণির ওপর। জিপিএ ৫প্রাপ্তি ব্যাপক বেড়ে যাওয়ার কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই ঘণ্টায় শিক্ষার্থীদের মাত্র ৫০ নম্বরের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে ১১ প্রশ্নের মধ্যে পরীক্ষার্থীদের ৭টি লিখতে হতো। এবার প্রশ্ন ১১টিই ছিল, তবে লিখতে হয়েছে মাত্র ৪টি; বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের মাত্র তিনটি। প্রশ্নের চয়েস অব অপশন বেড়ে যাওয়ার সুবিধা মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা পুরোপুরিই নিতে পেরেছে। তবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা এ সুবিধা কাজে লাগাতে পারেনি।

সিলেট বোর্ডের ফল খারাপ হয়নি বলে মনে করেন ওই বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রমা বিজয় সরকার। তিনি বলেন, গত বছর সব বিষয়ের পরীক্ষা হয়নি। তাই গত বছরের ফলের সঙ্গে তুলনা করলে চলবে না। সিলেট বোর্ডের ফল ভালোই হয়েছে। তিনি বলেন, সিলেটে এবার পরীক্ষার আগে বন্যায় ছাত্রছাত্রীদের বাড়িঘর ভেসে গেছে, বই নষ্ট হয়েছে; ত্রাণশিবির থেকে তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে কেন্দ্রে এসেছে। এটাই তো বড় অর্জন।

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ ফ ম বাহারুল আলম বলেন, এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় ৭টি বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। বাকি তিনটি বিষয়ের মূল্যায়ন করা হয়েছে অষ্টম শ্রেণির ফল থেকে। এ কারণে পূর্ণাঙ্গ ফলে তার প্রভাব পড়েছে। এতে পাসের হার ও জিপিএ কমেছে।

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কামরুল ইসলাম বলেন, করোনার সময় অটোপাস এবং পরে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা হয়েছে। সে তুলনায় এবারের ফল মোটামুটি ভালো। আমি মনে করি, প্রত্যাশিত ফল হয়েছে। কারণ করোনার সময় দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার বাইরে ছিল।
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. গাজী হাসান কামাল বলেন, গত বছর এসএসসি পরীক্ষা হয়েছিল আরও সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে। বেশ কয়েকটি পরীক্ষাও হয়নি। সে কারণে পাসের হার বেশি ছিল। বিষয় ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে যে বিষয়গুলোর পরীক্ষা হয়নি, সেগুলোর নম্বর দেওয়া হয়। এবার আগের চেয়ে বড় পরিসরে এবং আরও কিছু বিষয় বাড়িয়ে পরীক্ষা হয়েছে। এ কারণে স্বাভাবিক হার কিছুটা কমেছে।

এ বছর পাসের হার কম হওয়া বিষয়ে কুমিল্লা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. জামাল নাছের বলেন, তিন কারণে পাসের হার কমেছে। এ বছর সব বিষয়ে পরীক্ষা হয়েছে। তাই এর প্রভাব পড়েছে ফলে। সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্যার প্রভাব পড়েছে পরীক্ষা ও ফলে। এ ছাড়া রেজিস্ট্রেশন ও ফরম ফিলাপ করেও অনেক পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এর মধ্যে মেয়েদের কারও কারও বিয়ে হয়ে গেছে; ছেলেদের মধ্যে কেউ কেউ দেশের বাইরে কিংবা আর্থিক কারণে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে। এতে পরীক্ষার্থীও কমে গেছে। তাই সংগত কারণে পরীক্ষার্থীর সংখ্যার সঙ্গে পাসের হার কমে এসেছে।

বিষয় : মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষার ফল বড় সাফল্য

মন্তব্য করুন