পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার কাজী শামসুল হক ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির সব গণতান্ত্রিক সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত জুতা পরবেন না। তাতে অটল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নগ্নপদ ছিলেন। কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী শর্ষীনার পীর আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহর সহায়তায় ১৯৭১ সালের ১ জুলাই পাকিস্তান বাহিনীর ক্যাপ্টেন এজাজ পিরোজপুরের হুলারহাটে তাঁকে হত্যা করে। পরে শামসুল হকের মরদেহ স্থানীয় কচা নদীতে বিলীন হয়ে যায়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশাসনিক আদেশে শহীদ শামসুল হকের পরিবারকে ঢাকার মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে পৌনে দুই কাঠার একতলা বাড়ি (ও/২৮, ব্লক ডি) বরাদ্দ দেয় সরকার। সেই থেকে ৩৮ বছর ধরে ওই বাড়িতে থেকেছেন এবং তা থেকে উপকৃত হয়েছেন শহীদের স্ত্রী ও আট সন্তান। কিন্তু শান্তিতে নয়, বরং শহীদ পরিবারটি ১৯৮৬ সাল থেকেই রয়েছে উচ্ছেদ আতঙ্কে। পৈতৃক বা ক্রয়সূত্রে ওই বাড়ির মালিকানা দাবি করে 'কোর্ট অব সেটেলমেন্ট' এবং উচ্চ আদালতে বিভিন্ন সময়ে চারটি মামলা করা হয়েছে, যা নিষ্পত্তি হয়নি এখনও। বিভিন্ন সময় আদালত শহীদ পরিবারের পক্ষে রায় বা আদেশ দিলেও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বা নতুন করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। জীর্ণ-শীর্ণ বাড়িটি দখলে রাখা তাঁদের জন্য বোঝা হয়ে রয়েছে।

শহীদ সন্তান কাজী সাইফুদ্দীন মামুন সমকালকে বলেন, 'বাড়ি নিয়ে হওয়া মামলাগুলো রাষ্ট্রপক্ষ পরিচালনা করলেও আমরা পৃথকভাবে আইনজীবী নিয়োগ করে মামলা পরিচালনায় সহযোগিতা করে আসছি। কিন্তু আইনি চক্করে আমরাও এখন সর্বস্বান্ত। আদালত ও সরকার চাইলে বাড়িটি নিয়ে জটিলতার স্থায়ী সুরাহা হতে পারে।'

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা ও সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোর মধ্যে পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত কিছু বাড়ি ও সম্পত্তি বরাদ্দ দেন। দেশ স্বাধীন হলে প্রকৃত মালিকরা পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল। ১৯৭২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাড়িগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে দেওয়া বাড়িগুলো আশির দশকে এরশাদ প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বরাদ্দ দেন। তখন বরাদ্দের বাইরে থাকা সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত কিছু সম্পত্তি বিক্রিরও সার্কুলার জারি হয়েছিল।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে ৬ হাজার ৪৭১টি বাড়ি পরিত্যক্ত রয়েছে। এ পর্যন্ত ৩৫১টি পরিত্যক্ত বাড়ি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে বরাদ্দ হয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধুর আমলে বরাদ্দ পেয়েও কিছু পরিবার রাজনৈতিক কারণে বাড়ির দখল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, এমন ঘটনাও আছে। এর মধ্যে শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদের পরিবার অন্যতম।

একুশে ফেব্রুয়ারির অমর সংগীতের সুরকার আলতাফ মাহমুদকে ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট ঢাকার রাজারবাগের আউটার সার্কুলার রোডের নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তান বাহিনী। তিনি মুক্তিযুদ্ধে এমন সক্রিয় ছিলেন যে, তাঁর বাসায় মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আশ্রয় ছিল। পাকিস্তান বাহিনীর বন্দিত্বে অমানুষিক নির্যাতন সয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
শিশুকন্যাকে নিয়ে জীবনযাপনে অসহায়ত্বের মধ্যে আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী সারা আরা মাহমুদকে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু ঢাকার ১ নম্বর মালিবাগে একটি দোতলা বাড়ি বরাদ্দ দেন, যার প্রতীকী বিনিময়মূল্য ছিল ১০০ টাকা। অথচ ১৯৮২ সালে সেই বাড়ি থেকে আলতাফ মাহমুদের পরিবারকে উচ্ছেদ করে তৎকালীন বিএনপি সরকার। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে শহীদ আলতাফ মাহমুদের কন্যা শাওন মাহমুদ সমকালকে বলেন, 'বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর খুনিচক্র আমাদের বাড়িটি কেড়ে নেয়। সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধাও আর কখনও মেলেনি।'

শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আব্দুল মোক্তাদের ১৯৭১ সালের ১৯ মে স্বাধীনতাবিরোধী আলবদর ও রাজাকার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু এই শহীদ পরিবারকে ধানমন্ডির ১৯ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে একতলা পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দ দেন। পরে ১৯৮২ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তাঁদের ওই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।

শহীদ সন্তান তোয়ারিক মোকতাদের সমকালকে বলেন, 'স্বাধীনতার পর দুই সন্তান নিয়ে বাবার অবর্তমানে সংসার চালাতে মা হিমশিম খাচ্ছিলেন। এ কারণে মা বরাদ্দকৃত বাড়ির কিছু অংশ সাবলেট হিসেবে ভাড়া দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের সময় এটিকে কারণ দেখিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ফলে আমাদের সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। বাবা শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও এখন পর্যন্ত কোনো ভাতা বা অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা পাইনি। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর ১ হাজার টাকাসহ সমবেদনাপত্র দিয়েছিলেন।'
শহীদ কাজী আব্দুস সামাদের পরিবারকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকার মোহাম্মদপুরে শেরশাহ শুরী রোডে দ্বিতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৩ সন্তানকে নিয়ে ৩৬ বছর বসবাস করেন শহীদের স্ত্রী কাজী মনোয়ারা বেগম। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে হঠাৎ করেই বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ওই ফ্ল্যাট থেকে তাঁকে উচ্ছেদ করা হয়।

শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আজহারুল হকের স্ত্রী সালমা হককে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেন। ৫১ বছর পর সেই বাড়ি থেকে উচ্ছেদের শঙ্কায় রয়েছেন তিনি। সালমা হক সমকালকে জানান, ২০১৪ সালে হঠাৎ একজন ফ্ল্যাটের মালিকানা দাবি করে হাইকোর্টে মামলা করেন। পরে হাইকোর্ট তার বিপক্ষে রায় দেন। বর্তমানে রায়ের বিরুদ্ধে সালমা হকের করা আপিল উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোকে সরকারের উদ্যোগে বরাদ্দ দেওয়া বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিকানাসংক্রান্ত ৩৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর সন্তান ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সন্তানদের সংগঠন প্রজন্ম ৭১-এর সভাপতি আসিফ মুনীর তন্ময় এ প্রসঙ্গে সমকালকে বলেন, 'বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ঢাকা শহরে যাঁরা আবেদন করেছিলেন, তাঁদের বাড়ি বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে অনেককে বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ করার চেষ্টা হয়েছিল। কেউ কেউ আপিল করার পরে ফেরত পেয়েছেন। এসব ঘটনা জিয়াউর রহমানের আমলেই বেশি হয়েছে। সম্প্রতি আরও কয়েকটি শহীদ পরিবারকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা এ মুহূর্তে প্রকাশ্যে আসতে চাচ্ছেন না।'

শহীদ পরিবারদের উচ্ছেদের বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের নজরে নেওয়া হলে তিনি সমকালকে বলেন, 'আমাদের কাছে উচ্ছেদ হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন- এমন কেউ লিখিত আবেদন করলে মন্ত্রণালয় অবশ্যই জরুরি ব্যবস্থা নেবে। এসব ব্যাপারে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীও নির্দেশনা দেন।'

তিনি আরও বলেন, 'অসহায় শহীদ, যুদ্ধাহত ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দ চাইলে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় এসব ব্যাপারে অত্যন্ত ইতিবাচক।'


বিষয় : উচ্ছেদ আতঙ্কে বসবাস

মন্তব্য করুন