ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসেনি। এখনও পাহাড়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুলির শব্দ, দাঙ্গা, খুন, নিরীহ আদিবাসীদের উচ্ছেদ, জমি বেদখলসহ নানা অপতৎপরতা চলছে। বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে সন্ত্রাসী গ্রুপ। সর্বশেষ কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আবির্ভূত হয়েছে। শান্তির বদলে অশান্তি, নৈরাজ্য ও হানাহানি অতিষ্ঠ করে তুলছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তির ২৫তম বর্ষপূর্তি তথা রজতজয়ন্তীতে জুম্ম জনগণের যেখানে আনন্দ-উল্লাস করার কথা- সেখানে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, অভাব ও দৈন্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সমস্যাকে রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের কথা বলা হয়েছে। পাহাড়ি-বাঙালি স্থায়ী অধিবাসীদের অধিকারের যেসব বিষয় চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি- বলছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। ফলে অর্জিত হয়নি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণরূপে ও ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকি ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির হিসাব অনুযায়ী, মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং ২৯টি ধারার কাজ এখনও শুরু হয়নি। অবশিষ্ট ১৮টি ধারা আংশিকভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা সমকালকে বলেন, এক পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চুুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অপর পক্ষ বাস্তবায়ন কমিটি থেকে বলছে, চুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন হয়েছে। মূলত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য দুই পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার খুবই আন্তরিক।

জনসংহতি সমিতি সূত্র জানায়, শান্তিচুক্তির দুই দশকের বেশি সময়ে জুম্ম জনগণ আজ চরম বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। পাহাড়ের আদিবাসীদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার বলেন, রক্ত পিচ্ছিল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই চুক্তি স্বাক্ষরে পাহাড়ের জুম্ম জনগণ তাদের সমস্যা রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশায় বুক বেঁধেছিল। তাদের সে আশা আজও পূরণ হয়নি। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে দীর্ঘদিনেও পরিপূর্ণভাবে চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, পাহাড়ে এখনও সন্ত্রাস, দাঙ্গা, খুন, উচ্ছেদ, নিরাপত্তাহীনতা, ভূমি দখল, অপহরণসহ নানা গোলযোগ লেগেই আছে। ২৫ বছর আগে শান্তিচুক্তি করা হলেও পাহাড়ে এখনও শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি। চুক্তিবিরোধী পক্ষই এর জন্য দায়ী। এই দীর্ঘ সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে জীবনমানেরও উন্নয়ন হয়নি।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সাল থেকে ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। এই দীর্ঘ সময়েও তারা পার্বত্য চুক্তির মৌলিক বিষয় বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি। অবাস্তবায়িত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য রক্ষায় আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদসংবলিত বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন, আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি ও ব্যবস্থাপনা, বন-পরিবেশসহ ইত্যাদি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ও কমিশন গঠন করা হয়েছে। কিন্তু ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আইনের বিধিমালা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত করা হয়নি। ফলে গত ২৫ বছরেও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কোনো সফলতা আসেনি।
এ প্রসঙ্গে রাঙামাটির এমপি দীপংকর তালুকদার বলেন, ২৫ বছরেও পার্বত্য শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়াটা নিশ্চয়ই কষ্টের। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করছে পাহাড়ে অবস্থান নেওয়া অবৈধ অস্ত্রধারীরা। পাহাড় থেকে সব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হলে চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন সহজ হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি মুজিবুর রহমান বলেন, পার্বত্য চুক্তির ২৫ বছরে একটা পক্ষ লাভবান হয়েছে, অপর পক্ষ বঞ্চিত হয়েছে। পার্বত্য চুক্তির ধারাগুলোতে সাংবিধানিক সাংঘর্ষিক কিছু ধারা পরিবর্তন করা দরকার।

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, সরকার ও জনসংহতি সমিতি পাহাড়ি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পার্বত্যাঞ্চল শাখার সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাই সরকারকে রোডম্যাপ ঘোষণা করে জনসাধারণের কাছে পরিস্কার করতে হবে।


বিষয় : পাহাড়ে শান্তি ফেরেনি পাহাড়ে শান্তি

মন্তব্য করুন