'আই নিড ইউজড টিকিট' হাতে লেখা কাগজটি নিয়ে রাস ব্যু আবুদ মেট্রো স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির দিকে টিকিট সংগ্রহে থাকা সৌভাগ্যবানরা এক ধরনের অনুকম্পার হাসি দিয়েই বেরিয়ে পড়ছেন। একটু আগে মাঠে দেখে আসা আর্জেন্টিনার জয়ের ঘোর তখনও কাটেনি। গায়ে মেসির ১০ নম্বর জার্সি আর মুখে 'মুচাচো, হোরা নো ভোভিমোস ইলুসিনা'র সুর। দোহার রাত ৩টায়ও এই সুর যেন জাগিয়ে রেখেছিল গোটা নগরীকে। কী জাদু এই সুরে! ছেলে-বুড়ো সবাই মিলে কী-ই বা বলতে চাইছে এই গানে? ভিড়ের মাঝেই পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই এক আর্জেন্টাইন সমর্থক মারিয়ানো ইংলিশে তর্জমা করে বুঝিয়ে দিলেন কিছুটা। সব আর্জেন্টাইন গাইছে- 'বয়েজ, আমরা আমাদের আশা এগিয়ে নিয়ে যাব। আমি জন্মেছি আর্জেন্টিনায়, যেখানে জন্মেছে ম্যারাডোনা-মেসি। আমরা জিতবই তৃতীয় বিশ্বকাপ।' গানটি কে লিখেছিলেন, তা বলতে পারলেন না পেশায় অধ্যাপক ওই ভদ্রলোক। তবে এটুকু জানিয়েছেন, যেদিন থেকে ফুটবল বুঝতে শিখেছেন, সেদিন থেকেই তিনি এই গানও শিখেছেন। আর্জেন্টিনার নাকি দুটি নিয়ম- এক. জাতীয় সংগীত গাইতে হবে; দুই. ফুটবলের এই সংগীতটি অবশ্য অবশ্যই গাইতে হবে।

বলতে বলতেই মারিয়ানোর অঙ্ক কষা শেষ। সেমিফাইনালে তাহলে ফ্রান্স কিংবা ইংল্যান্ড! আজ বাদে কাল যেখানে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে শেষ ষোলোর নকআউট, তার পর কোয়ার্টার, তার ওপরে গিয়ে সেমিফাইনাল! উত্তরে যা বোঝাতে চাইলেন ওই সমর্থক তা অনেকটা এমন- অস্ট্রেলিয়া হলো হাতে পাওয়া মোয়া। এরপর নেদারল্যান্ডসও সমস্যা হবে না। সেমিতে গিয়ে যদি আরেকটা হার্ডেল দিতে হয়। মারিয়ানা বোধ হয় পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা আর্জেন্টাইনদের প্রতিচ্ছবি। তাই তাঁর কথাগুলোই মনে পড়ছে বেশি। আর এই সমর্থকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছেন লিওনেল মেসি। 'অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচটি কিন্তু কঠিন হবে। এখানে যে কোনো দল যে কাউকে যখন তখন হারিয়ে দিতে পারে। বিশ্বকাপে সবকিছুই সম্ভব।' সৌদি আরবের শিক্ষাটাই যেন মেসিকে এতটা সতর্ক করেছে, তা কাউকে না বললেও বুঝে নেওয়া যায়।

কিন্তু প্রতিপক্ষের চেয়েও এ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে 'সময়'। আগের দিন লকার রুমেও জয় উদযাপন করেছেন তাঁরা, কিন্তু সেই ভিডিও যাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় না আসে, এ জন্য নাকি টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে সবাইকে বলে দেওয়া হয়েছিল। বিশ্বকাপে আসা আর্জেন্টাইন সাংবাদিকদের কাছেই এসব শোনা। আগের রাতে হোটেল ফিরতে ফিরতে নাকি রাত ৩টা বেজে গিয়েছিল মেসিদের। সকালে অ্যালার্ম দিয়ে ঘুম থেকে উঠে সাড়ে ১১টা থেকে ফের অনুশীলন। সময়ের সঙ্গে দৌড়াতে হচ্ছে মেসিদের। দোহা-বুয়েন্স আয়ার্স সময়ের পার্থক্য প্রায় ছয় ঘণ্টার। তাই মাঝের সময় বাঁচিয়ে পরিবারের সঙ্গেও কথা বলতে হয়। এ ছাড়া গ্রুপ পর্বের এমন একটি ম্যাচ শেষ হওয়ার দু'দিন বাদেই কিনা শেষ ষোলোর ম্যাচ। বিরক্তি চেপে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনার কোচ স্কালোনি। 'নকআউট পর্বে এত ঠাসা সূচি দেওয়াটা পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। একটি ম্যাচের পরের দিনই ফের অনুশীলনে নামতে হচ্ছে। তা ছাড়া সবাই জানে, দোহার কন্ডিশন কতটা কঠিন। এ অবস্থায় ফুটবলারদের মানসিক ও শারীরিক চ্যালেঞ্জটা বেড়ে যাচ্ছে। তার পরও নিয়ম যখন সবার জন্যই এক, তখন এ নিয়ে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই।' ফিফার আইনে সমস্যা হতে পারে, তাই হয়তো ইঙ্গিতেই মনঃকষ্ট বুঝিয়েছেন স্কালোনি। তবে দলের অন্যতম খেলোয়াড় ডি মারিয়ার চোট কিন্তু ভাবাচ্ছে তাঁকে। প্রচ গরমে অনুশীলন, দু'দিন বাদে বাদে ম্যাচ- সব মিলিয়ে ধকল নিতে পারছেন না অনেকে।

এদিকে গতকালও কাতারের মিডিয়া সেন্টারে ভিনদেশি সাংবাদিকদের কানাকানি- আর্জেন্টিনাকে দেওয়া পেনাল্টিটা ঠিক ছিল কিনা? চাপের ম্যাচে মেসির পেনাল্টি মিস নিয়েও রয়েছে ফিসফিসানি। যদিও মেসি নিজেই পরিস্কার করেছেন, পেনাল্টি মিসের আফসোস থাকলেও কষ্ট নেই। 'পেনাল্টি মিসের পরেই কিন্তু দল আরও শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমি শুরু থেকেই বলে আসছি, একবার কেউ যখন বুঝতে পারবে দলে তার করণীয়টা কী, তখন সে সেভাবেই প্রস্তুতি নেবে এবং সেটা কাজেও লাগাতে পারবে।' মেসি বলছিলেন অ্যালেক্সিস অ্যালিস্টার আর এনজো ফার্নান্দেজের কথা, যাঁদের মধ্যেই তিনি দলের উত্তরসূরি খুঁজে পেয়েছেন।