নাম রাজার দীঘি। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে প্রজাদের পানীয় জলের জন্য পঞ্চগড় শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার উত্তরের উপজেলা বোদা বাজার এলাকায় বিশালকায় এই জলাশয় খনন করেছিলেন কোচবিহারের মহারাজ। ১৯৪০ দশকের মাঝামাঝি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে এসে ওই দীঘির দক্ষিণ পাড়ে বসতি গড়েছিলেন যতীন্দ্র মোহন সাহা। তিনি মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে চিকিৎসায় ডিপ্লোমা কোর্স করে ক্রমে এলাকায় পল্লিচিকিৎসক হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।

যতীন সাহার বাড়ি একসময় লোকে লোকারণ্য থাকত। সামাজিক মানুষটিকে ঘিরে চলত নিত্যদিনের আড্ডা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর পরে ১৭ এপ্রিল ওই বাড়ি থেকে যতীন সাহাকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে বোদা উপজেলার প্রথম শহীদ। পরে তাঁর মরদেহ এনে বাড়ির সামনে খোলা জায়গায় সমাধিস্থ করে গ্রামবাসী। কিন্তু সেই বাড়ি বা সমাধিস্থল কোনো কিছুই এখন আর নেই যতীন সাহার পরিবারের দখলে। উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে অভাবের দায়ে বাড়ি ও সমাধিস্থল দুই-ই বিক্রি করে দিয়েছেন তাঁরা।

যতীন সাহার সেজ ছেলে জয়দেব কুমার সাহা মন্টু বর্তমানে বোদা পৌরসভা বাজারে ফুটপাতে খিলি পান বিক্রি করেন। তাঁর বয়স ৬৭ বছর। তাঁরা পাঁচ বোন ও চার ভাই। পারিবারিক জমিজমা ভাগ হওয়ার পর ১৯৯৬ সালে দুই ভাই অভাবের তাড়নায় বসতভিটা বিক্রি করে অন্যত্র চলে যান। জয়দেব সাহা ও তাঁর মেজ ভাই জয়ন্ত কুমার সাহা নিজেদের অংশে কষ্টেসৃষ্টে মাথা গুঁজে আছেন। তাঁদের মা, দুই ভাই ও দুই বোন মারা গেছেন।

সরকারের কাছে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে জয়দেব সাহা বলেন, 'বাবার কবর সংরক্ষণ করা হোক। তিনি এলাকার প্রথম শহীদ। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। বসতভিটা ছাড়া আমাদের আর কিছু নাই। সরকার যদি কিছু দেয় তাহলে ভালো হয়।'

যতীন সাহা সরাসরি রাজনীতি না করলেও বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সংগঠিত হন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে। পঁচিশে মার্চের পর প্রায় তিন সপ্তাহ বোদা মুক্ত ছিল। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানি বাহিনী সেখানে হানা দেয়। ১৭ এপ্রিল ছিল সেই বিভীষিকাময় দিন। যতীন সাহা একাই বাড়িতে ছিলেন। যতীন সাহার জামাই দীনেশ চন্দ্র সাহাসহ বাড়ির অন্য সবাই আগেই সীমান্তে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যতীনকে নেওয়ার জন্য তাঁর ছেলে জীবনকৃষ্ণ সাহা সন্তু এলেও তিনি তাঁকে ফেরত পাঠিয়ে নিজে বাড়ি আগলে ছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় যতীন সাহার বাড়িতে ঢুকে তাঁকে আটক করে। তিনি কী করেন জানতে চাইলে বলেছিলেন, কম্পাউন্ডার। পাকিস্তানিরা ভেবে নেয় কমান্ডার। তাঁর গায়ের চাদর দিয়েই দুই হাত বেঁধে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে কারকুনবাড়ি যাওয়ার পথে গুলি করে হত্যা করে। যতীন সাহাকে গ্রামবাসী তাঁর বাড়ির সামনে নিজ জমিতে কবর দিয়েছিল। সন্তানরা সমাধিস্থলসহ জমি বিক্রি করে দেওয়ার পরে সেখানে অন্য মালিকানায় এখন একটি দ্বিতল ভবন গড়ে উঠেছে।

যতীন সাহার সমাধিস্থল সংরক্ষণের বিষয়ে বোদা পৌর মেয়র অ্যাডভোকেট ওয়াহিদুজ্জামান সুজা সমকালকে বলেন, 'সেই জমি বিক্রি হয়ে যাওয়ায় সমাধিস্থল সংরক্ষণের সুযোগ নেই। তবে জেলা প্রশাসন চাইলে যতীন সাহার স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে পারে।'

জেলা প্রশাসক মো. জহরুল ইসলাম বলেন, জেলার সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী ৫৩ জন শহীদের নাম পাওয়া গেছে। যতীন সাহার নামও রয়েছে। আমরা জেলার ৪৩টি ইউনিয়নে 'মুক্তিযুদ্ধ কর্নার' করেছি, সেখানে শহীদ যতীন সাহার নাম রয়েছে। তাঁর সমাধিস্থল সংরক্ষণের বিষয়টি নজরে এসেছে। স্মৃতি কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সেটি আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণে আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। যতীন সাহা যেহেতু বোদা উপজেলার প্রথম শহীদ, তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শহীদদের তালিকা করা হলে যতীন সাহার নামও তালিকাভুক্ত হবে।

শহীদ যতীন সাহার সমাধিস্থলে বর্তমানে যে বাড়ি নির্মিত হয়েছে, সেই বাড়ির মালিক বলরামপুর আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মো. কামরুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, ১৯৯৬ সালে জমিটি কিনেছেন। তখন যতীন সাহার কবর তাঁর ছেলেরা পাশের জমিতে সরিয়ে নেন। সেখানেও বাড়ি উঠেছে। সরকার যদি বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে যতীন সাহার স্মরণে কিছু করতে চায়, সেটা আলোচনার মাধ্যমে হতে পারে।

তবে যতীন সাহার ছেলে জয়দেব সাহা জানিয়েছেন, কবর সরানো হয়নি।

সাড়ে সাত মাস যুদ্ধের পর যৌথ বাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পিছু হটলে ২৯ নভেম্বর পঞ্চগড় মুক্ত হয়। এখন পর্যন্ত পঞ্চগড় জেলায় ১৭টি গণকবর ও ৬৪৯টি গণহত্যা, ২৩টি নির্যাতন কেন্দ্র চিহ্নিত হয়েছে। এগুলোর অধিকাংশ এখনও সংরক্ষিত হয়নি।