রংপুর সদরের কৈলাস রঞ্জন হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শংকু সমাজদার। তিন ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে হরতালের সমর্থনে ডাকা মিছিলে বড় ভাই কুমারেশ সমাজদারের সঙ্গে যোগ দেয় শংকু সমাজদার। মিছিলটি সকাল ১০টার পর রংপুর শহরের আলমনগর এলাকায় যেতেই হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হয় কিশোর শংকু। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। মিছিলটি তখন ছত্রভঙ্গ হলেও ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিল রংপুরসহ পুরো দেশ।
শংকু সমাজদার রংপুর অঞ্চলের প্রথম শহীদ। এদিন পাকিস্তানি বাহিনী ও সমর্থকদের গুলিতে আরও দুই জন শহীদ হন। তাঁরা হলেন আবুল কালাম আজাদ এবং ওমর আলী। আরও কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। এ ঘটনার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দেওয়া ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেও রংপুরের রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হওয়ার কথা বলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার অব্যবহিত পূর্বে শহীদ শংকুর পরিবারকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু রংপুর সদরের কামাল কাছনায় (বর্তমান ২৪ নম্বর ওয়ার্ড) ১০ শতাংশ জমিসহ একটি টিনের ঘর বরাদ্দ দেন। শংকু সমাজদারের নাম সরকারিভাবে শহীদের তালিকায় থাকলেও কোনো ভাতা পায়নি তার পরিবার। বড় ভাই কুমারেশ সমাজদার করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০২০ সালের ৩ জুলাই মারা যান। দুই সন্তানকে হারিয়ে অসহায় জীবন যাপন করছেন তাঁদের মা দীপালি সমাজদার। জীবনসায়াহ্নে ৮৫ বছরের এই বৃদ্ধার একটাই দাবি- শহীদ সন্তান শংকু সমাজদার স্মরণে রংপুরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক।
দীপালী সমাজদার সমকালকে বলেন, 'আমি খুব কষ্টে আছি। বড় ছেলেটাও মারা গেছে। মেয়েটা দেখাশোনা করে। আমার একটাই চাওয়া- শংকুর নামে সরকার স্মৃতিস্তম্ভ করুক। টাকা-পয়সা দিলে দিক; না দিলে নাই। ছেলেটা দেশের জন্য রক্ত দিছে। তারে সবাই মনে রাখুক।'

১৯৭০ সালের নির্বাচনে গোটা পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করলেও দু'দিন আগে কোনো কারণ ছাড়াই তা স্থগিত করা হয়। স্থগিতের ঘোষণা শুনেই ১ মার্চ তাৎক্ষণিক সারাদেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ৩ মার্চ হরতাল পালিত হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। এদিন সারাদেশের মতো ক্ষোভে উত্তাল ছিল রংপুরও।

শহীদ শংকুর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে সেই মিছিলের সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা রংপুর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোছাদ্দেক হোসেন বাবলু সমকালকে বলেন, 'হরতালের সমর্থনে সাধারণ মানুষ শহরের পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে সমবেত হয়। সাড়ে ৯টার পর মিছিল শুরু হয় এবং শহরের কিছু এলাকা প্রদক্ষিণ করে স্টেশন রোড দিয়ে এগোতে থাকে। মিছিলটি যখন আলমনগর এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল তখন উর্দুতে লেখা একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়ে আমাদের। বর্তমান ঘোড়াপীর মাজারের সামনে সে সময় অবাঙালি সরফরাজ খানের বাসায় (বর্তমান আমদানি রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়) উর্দুতে লেখা ওই সাইনবোর্ড মিছিলে থাকা কয়েকজন নামাতে যায়। আর তখনই বাসার ভেতর থেকে মিছিলটি লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হতে থাকে। সেখানে গুলিবিদ্ধদের মধ্যে ১৩ বছরের কিশোর শংকু সমাজদারও ছিল। মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় গুলিবিদ্ধ কয়েকজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে শংকু মারা যায়। হাসপাতালে মারা যান আরও দু'জন।'
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন- 'আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভায়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে।' রংপুরের কথা বলে বঙ্গবন্ধু শংকুসহ শহীদ হওয়া তিনজনের কথাই বলেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার ৫১ বছরেও শংকু স্মরণে রংপুরে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়নি। অপর দুই শহীদ পরিবার সম্পর্কে মোছাদ্দেক হোসেন বলেন, তাঁরা মোটামুটি চলতে ফিরতে পারেন। তবে শংকুর পরিবার অসহায়।

শংকুর বাবা সন্তোষ কুমার সমাজদার ছিলেন পুরোহিত। তিনি ২০০৯ সালে মারা যান। শংকুর একমাত্র বোন ঝর্ণা ব্যানার্জী মায়ের দেখাশোনা করেন। স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষিকা ঝর্ণা সমকালকে বলেন, 'মায়ের বয়স ৮৫ বছর। তিনি ভীষণ অসুস্থ। দুইবার স্ট্রোক হয়েছে। সিটি করপোরেশন মায়ের চিকিৎসায় মাসে ৫ হাজার টাকা ভাতা দিচ্ছে। স্কুল থেকে যা পাই, তাই দিয়ে মা এবং আমার সংসার চলছে।' তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুর সরকার তাঁদের ১০ শতাংশ জমি দিয়েছিলেন, যা অনেক বছর পরে ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসন রেজিস্ট্রিমূলে দলিল করে দিয়েছে।

শহীদ শংকু স্মরণে বেসরকারি উদ্যোগে ২০২০ সালে একটি বিদ্যানিকেতন গড়ে তোলা হয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উমর ফারুক এই বিদ্যানিকেতনের উদ্যোক্তা। এ প্রসঙ্গে তিনি সমকালকে বলেন, 'শহীদ শংকু সমাজদার একটি সাহসের নাম। তার মায়ের ইচ্ছানুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান শহীদ শংকুর চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আগামী প্রজন্মকে জানাতে কাজ করে যাচ্ছে।'

জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ বিষয়ে রংপুরের জেলা প্রশাসক মো. আসিব আহসান সমকালকে বলেন, 'শহীদ শংকু সমাজদারের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য তার বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-সংবলিত একটি তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। তার পরিবারের থাকার জন্য তাদের বাড়ি সংস্কার এবং বাড়ির সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। আরও যদি কিছু করা যায়, অবশ্যই সেটা পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রংপুরে ছোট-বড় অনেক বধ্যভূমি থাকলেও সরকারিভাবে ১৩টি চিহ্নিত করা হয়েছে। বেশিরভাগ বধ্যভূমিতে নামফলক ও শহীদদের তালিকা টাঙানো হয়নি। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান।
জেলা প্রশাসক মো. আসিব আহসান বলেন, শহীদদের নামের তালিকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তৈরি করা হচ্ছে, যা এখনও চলমান। ৫টি বধ্যভূমি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে নির্মিত হয়েছে এবং রংপুর সেনানিবাসের পশ্চিমে নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমিতে স্মারক নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এ ছাড়া রংপুর টাউন হলের পেছনে একটি বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধে 'বাঙালি নারীদের টর্চার সেল' হিসেবে পরিচিত ছিল। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে এই শহীদদের ত্যাগ ও দেশপ্রেমের কথা জানতে পারে, সে লক্ষ্যে এই বধ্যভূমি তথা টর্চার সেল থেকে উদ্ধারকৃত কাপড় ও হাড় উত্তরবঙ্গ জাদুঘরে সংরক্ষণের জন্য দেওয়া হয়েছে।